বিধানসভা ভোটের ফলাফল ঘোষণার এক মাস অতিক্রান্ত। কিন্তু এই অল্প সময়ের ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে যে আমূল পরিবর্তন ও টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একসময়ের অপ্রতিরোধ্য এই সংগঠন এখন নানাবিধ জটিলতায় জর্জরিত। অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীগত কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াই দলটিকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রিত সংগঠনের উপর বর্তমানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীদের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবুও দলের অন্দরে অস্বস্তি যে চরমে পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট। তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এই নতুন সমীকরণ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সবথেকে বড় প্রশ্ন উঠেছে দলের ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে, দলীয় বিভাজন বা গোষ্ঠীকোন্দলের পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রতীকের অস্তিত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাটানি হতে পারে কি না। যদিও অনেকেই এই আশঙ্কাকে অতিরঞ্জিত মনে করছেন, তবুও প্রতীক ও দলের পরিচয় নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি দানা বাঁধছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ঘরোয়া আলোচনায় এখন দলকে কার্যত দুটি ভাগে ভাগ করছেন—একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘তৃণমূল (ম)’, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ ‘তৃণমূল (ঋ)’। যদিও এই বিভাজন সরকারি বা আনুষ্ঠানিক নয়, তবুও রাজনৈতিক পরিসরে এই দুটি পরিচয় ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে।
তৃণমূলের অন্দরে এই গোলমালের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—দলের বিশাল তহবিল। রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, তৃণমূলের বিপুল আর্থিক তহবিল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নাকি নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। যদি ভবিষ্যতে এই তহবিলের ওপর গোষ্ঠীগত আধিপত্যের ছায়া পড়ে, তবে সংগঠন পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন দলের একাংশ।
এই অস্বস্তির মধ্যে কালীঘাট ঘনিষ্ঠ এক শীর্ষ নেতার মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাঁর আক্ষেপের সুরে উঠে এসেছে দলের বর্তমান সংকটের ছবি। তিনি জানান, গত পনেরো বছরে দলের অনেক শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রী বিপুল আর্থিক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অর্জন করলেও, দলের দুর্দিনে তাঁদের ওপর ভরসা করা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে খোদ নেত্রী পুনর্মূল্যায়ন করছেন। ওই নেতার কথায়, “সুদিনে সবাই পাশে থাকে, কিন্তু দুর্দিনে দলের তিজোরি খোলার মানুষ হাতেগোনা।” দলের অভ্যন্তরীণ এই আর্থিক ও নেতৃত্বের সংকট আগামী দিনে তৃণমূল কংগ্রেসকে কোন গন্তব্যে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।





