লোকসভা নির্বাচনের আবহে এবার খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক মন্তব্য নিয়ে রণক্ষেত্র রাজ্য রাজনীতি। নির্বাচনী সভা থেকে ‘চামার’ শব্দ ব্যবহার করে তফসিলি জাতিকে অপমানের অভিযোগ উঠল তাঁর বিরুদ্ধে। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবার স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করল জাতীয় তফসিলি জাতি কমিশন (NCSC)। আগামী ৩ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে এই বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট তলব করা হয়েছে।
ঠিক কী ঘটেছিল?
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৩ এপ্রিল। কলকাতার চৌরঙ্গিতে তৃণমূল প্রার্থী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে জনসভা করছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। অভিযোগ, সেখানেই ভাষণের একটি অংশে তিনি ‘চামার’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ২৬ এপ্রিল দিল্লি থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে কমিশন জানায়, এই শব্দ ব্যবহার শুধু আপত্তিকর নয়, বরং তফসিলি জাতি ও উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনের ৩(১)(এস) ধারায় এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
‘চামার’ শব্দটি কেন এত স্পর্শকাতর?
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একটি সাধারণ পেশাভিত্তিক শব্দ কেন আইনি বিপত্তি ডেকে আনতে পারে? সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণা এর গভীরে আলোকপাত করেছে:
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সংস্কৃত ‘চর্ম’ (চামড়া) শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। ঐতিহাসিকভাবে যারা চামড়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের ‘চর্মকার’ বা ‘চামার’ বলা হতো।
সামাজিক বঞ্চনা: নৃতাত্ত্বিক গবেষক জি. ডব্লিউ. ব্রিগসের মতে, ভারতীয় বর্ণব্যবস্থায় এই সম্প্রদায়কে দীর্ঘকাল ‘অস্পৃশ্য’ এবং অবদমিত শ্রেণির তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
আইনি বাধা: অতীতে এই শব্দটিকে গালি হিসেবে বা কাউকে ছোট করতে ব্যবহার করা হতো। ফলে স্বাধীন ভারতে দলিত সমাজের সম্মান রক্ষার্থে এই শব্দের অবমাননাকর ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ।
নেপাল থেকে ভারত: এক দীর্ঘ লড়াই
শুধু ভারত নয়, নেপালের তরাই অঞ্চলেও এই সম্প্রদায়ের বড় অংশ বসবাস করেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, হিন্দু বর্ণাশ্রমের তলানিতে এই সম্প্রদায়কে রাখার যে কুপ্রথা ছিল, তা আজও পুরোপুরি মুছে যায়নি। ফলে নির্বাচনী মঞ্চের মতো জায়গায় এই শব্দের ব্যবহার গোটা সম্প্রদায়ের আবেগে আঘাত করতে পারে বলে মনে করছে কমিশন।
কমিশনের কড়া নির্দেশ
তফসিলি কমিশন সাফ জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারে এই ধরণের শব্দ ব্যবহার পরিস্থিতিকে সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রাজ্য প্রশাসনকে জানাতে হবে কেন এই ধরণের শব্দ ব্যবহার করা হলো এবং এর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ভোটের মুখে এই বিতর্ক কি মমতার জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হবে? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ? উত্তরের অপেক্ষায় রাজনৈতিক মহল।





