পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের মেঘ আরও ঘনীভূত করে ইরানকে এক নজিরবিহীন পাঁচ দফা ‘শান্তিপ্রস্তাব’ দিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মতে, একে শান্তিপ্রস্তাব বলা ভুল, আসলে এটি তেহরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আমেরিকার এক চরম শর্তাবলী। ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে টানটান উত্তেজনার আবহে গুঞ্জন শুরু হয়েছে যে, যে কোনও মুহূর্তে ইরানে আবার বিধ্বংসী বিমান হামলা চালাতে পারে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ বাহিনী। আর সেই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মাঝেই ট্রাম্পের এই বিতর্কিত প্রস্তাব ঘিরে তোলপাড় আন্তর্জাতিক রাজনীতি।
ইরানের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজের (Fars News) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের তরফে তেহরানকে যে ৫টি কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেগুলি হলো:
১) ইরানের কাছে এই মুহূর্তে যে ৪০০ কিলোগ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, তা অবিলম্বে আমেরিকার হাতে তুলে দিতে হবে।
২) ইরানে মাত্র একটিই পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র সচল রাখা যাবে। বাকি সমস্ত পরমাণু কেন্দ্র চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে।
৩) আমেরিকার দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, ওয়াশিংটন তার এক পয়সাও মেটাবে না।
৪) বিদেশে ইরানের যে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ‘ফ্রিজ়’ বা বাজেয়াপ্ত করে রাখা হয়েছে, তার ২৫ শতাংশও ফেরত পাবে না তেহরান।
৫) বিভিন্ন সীমান্তে এখনও যে সংঘর্ষ জারি রয়েছে, তা পুরোপুরি বন্ধ হবে কি না, তা নির্ভর করছে এই আলোচনার ওপর। এই আলোচনা ফলপ্রসূ হলেই একমাত্র যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভাববে আমেরিকা।
ট্রাম্পের জালে জড়াতে নারাজ তেহরান
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য ইরান এর আগে আমেরিকাকে যে সব প্রস্তাব দিয়েছিল, ট্রাম্পের এই পাঁচ শর্ত তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ইরান প্রথম থেকেই তাদের ওপর বসা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিপূরণ দাবি করে এসেছে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনও আলোচনা করতেই তারা ইচ্ছুক নয়। আগে সীমান্তে সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হোক, তারপরই পরমাণু চুক্তি নিয়ে ভাবা যাবে। ফলে ট্রাম্পের এই একতরফা প্রস্তাবে ইরান যে কোনওভাবেই রাজি হবে না, তা নিয়ে প্রায় নিশ্চিত ভূরাজনীতির বিশেষজ্ঞরা।
চুক্তি না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের!
এদিকে, ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে এক বিস্ফোরক দাবি করা হয়েছে। তাদের দাবি, ট্রাম্পের এই তথাকথিত শান্তিপ্রস্তাবের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে প্রচ্ছন্ন সামরিক হুমকি। মার্কিন প্রস্তাবে নাকি প্রকারান্তরে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তেহরান যদি এই ৫টি শর্ত মেনেও নেয়, তাহলেও তাদের ওপর হামলা হবে না— এমন কোনও গ্যারান্টি ওয়াশিংটন দিচ্ছে না। উপরন্তু, চুক্তি স্বাক্ষর না হলে ইরানের প্রতিটি প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার লাইফলাইন তথা সেতুগুলি বোমাবর্ষণ করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প।
আমেরিকার এই আগ্রাসী কূটনীতির কড়া জবাব দিয়েছে ইরানও। হোয়াইট হাউসের এই দাদাগিরির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমায়েল বাকেই স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমেরিকা বা ইজরায়েল যদি আবার ইরানের মাটিতে হামলা চালানোর ধৃষ্টতা দেখায়, তবে ইরানও এমন বিধ্বংসী প্রত্যাঘাত করবে যা তারা কল্পনাও করতে পারবে না।” তেহরানের সরাসরি অভিযোগ, কূটনীতিকে ঢাল করে আসলে নিজেদের সামরিক লক্ষ্যপূরণ করতে চাইছে আমেরিকা। দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের কারণে পশ্চিম এশিয়ায় আবার এক রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।





