ভারতের রাজনীতির অলিন্দে প্রতিনিয়ত কত বিচিত্র ঘটনাই না ঘটে! তবে এবার যা ঘটল, তা এককথায় নজিরবিহীন। দেশের রাজনীতিতে এবার ডানা মেলে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে এক ‘আরশোলা’। আর তাতেই তোলপাড় নেটপাড়া থেকে শুরু করে দিল্লির নির্বাচন সদন (ECI)। মাত্র পাঁচ দিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় পথ চলা শুরু করা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janta Party) বা সিজেপি (CJP) ইনস্টাগ্রামে অনুগামীর সংখ্যার নিরিখে এক ধাক্কায় পিছনে ফেলে দিয়েছে খোদ বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)-কে!
সমালোচকরা একে ‘সোশ্যাল মিডিয়া গিমিক’ বা সস্তা রসিকতা বলে উড়িয়ে দিলেও, এই আরশোলা পার্টির অনলাইন ক্রেজ কিন্তু রীতিমতো চমকপ্রদ। ইতিমধ্যেই জল্পনা ছড়িয়েছে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের দু’জন বর্তমান সংসদ সদস্য (MP) নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিজেপি-তে ‘যোগ’ দিয়েছেন! আমেরিকার বোস্টন শহর থেকে এই দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে রিমোট কন্ট্রোলে দল চালানো সত্ত্বেও ভারতের একাধিক রাজ্যে ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সিজেপি-র শাখা ইউনিট গজিয়ে উঠেছে। তবে বৃহস্পতিবারই এই ‘ককরোচ পার্টি’র এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টটি ভারত সরকারের নির্দেশে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।
এই টানাপড়েনের মাঝেই এবার লাখ টাকার প্রশ্ন উঠেছে— এই ককরোচ জনতা পার্টি যদি সত্যিই কোনোদিন ভোটের ময়দানে নামে, তবে কি তারা ‘আরশোলা’ প্রতীক নিয়ে ভোটে লড়তে পারবে?
প্রতীক তরজা: কী বলছে নির্বাচন কমিশনের আইন?
সিজেপি অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেছে, তাদের নির্বাচনী প্রতীক হবে ‘মোবাইল ফোন’। কিন্তু তারা যদি গোঁ ধরে বসে যে ‘আরশোলা’ প্রতীকের জন্যই আবেদন করবে, তবে কি নির্বাচন কমিশন তা মঞ্জুর করবে? এক লাইনে এর উত্তর হলো— তাত্ত্বিকভাবে তা সম্ভব হলেও, বাস্তবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের কড়া আইনের দেওয়ালে এই আরশোলা পিষে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
ভারতের ‘দি ইলেকশন সিম্বলস অর্ডার, ১৯৬৮’ অনুযায়ী, যেকোনো নতুন দলকে ভোটে লড়তে গেলে প্রথমে কমিশনের কাছে রেজিস্টার্ড হতে হয়। নথিভুক্ত কিন্তু অস্বীকৃত দলগুলিকে সাধারণত নির্বাচন কমিশনের দেওয়া একটি ‘মুক্ত প্রতীক’ বা ফ্রি সিম্বলস (Free Symbols)-এর তালিকা থেকে নিজেদের পছন্দের প্রতীক বেছে নিতে হয়। কমিশনের সেই তালিকায় তালা-চাবি, এয়ার কন্ডিশনার, ল্যাপটপ বা নেল কাটারের মতো একশোর বেশি হরেক রকমের আধুনিক প্রতীক থাকলেও, সেখানে কোনো ‘আরশোলা’ বা সিজেপি-র দাবি করা ‘মোবাইল ফোন’ প্রতীকের কোনো অস্তিত্বই নেই!
আইনি মারপ্যাঁচ: নতুন দল চাইলে তালিকায় না থাকা সম্পূর্ণ নতুন প্রতীক বা নকশা কমিশনের কাছে প্রস্তাব করতে পারে। কিন্তু নিয়মে স্পষ্ট বলা রয়েছে, নতুন কোনো রাজনৈতিক দল তাদের প্রতীক হিসেবে কোনো ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না, এবং একই সঙ্গে কোনো ‘পশুপাখি বা পতঙ্গ’ (Animal Kingdom)-এর ছবি বা অবয়ব প্রস্তাব করতে পারবে না।
মায়াবতীর ‘হাতি’ আর ফরওয়ার্ড ব্লকের ‘সিংহ’ ছাড় পেল কীভাবে?
প্রশ্ন উঠতেই পারে, ভারতের ভোটে বহু পুরনো দল তো হাতি বা সিংহ প্রতীক নিয়ে লড়ছে, তাহলে নতুনদের ক্ষেত্রে এই বারণ কেন? আসলে এই নিষেধাজ্ঞা কিন্তু নতুন নয়। ১৯৯১ সাল থেকেই নির্বাচন কমিশন ভোটে নতুন কোনো পশুপাখির প্রতীক দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। ২০০৮ ও ২০১২ সালে পশুপ্রেমী ও বন্যপ্রাণী অধিকার কর্মীদের লাগাতার প্রতিবাদের পর কমিশন এই কড়া অবস্থান নেয়।
পশুপ্রেমীদের অভিযোগ ছিল, ভোটের প্রচারের সময় আসল হাতি, বাঘ, সিংহ বা ছাগল নিয়ে মিছিল করা হয় এবং তাদের ওপর চরম নিষ্ঠুরতা চালানো হয়। ২০১২ সালে কমিশন স্পষ্ট নির্দেশ দেয়, নির্বাচনী প্রচারে কোনো পশুপাখি ব্যবহার করা যাবে না। কেবল মাত্র বহু প্রাচীন দল হিসেবে মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টির ‘হাতি’ এবং অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লকের ‘সিংহ’ প্রতীককে ‘ঐতিহাসিক ব্যতিক্রম’ (Legacy Exception) হিসেবে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন কোনো দলের ক্ষেত্রে এই নিয়ম অত্যন্ত কঠোর।
আপাতত ককরোচ জনতা পার্টির এই দাপট সম্পূর্ণভাবেই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বা সোশ্যাল মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ। এটি আগামী দিনে সত্যি কোনো রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে দেশের নির্বাচন কমিশন যে এত সহজে ইভিএম (EVM)-এর ব্যালট পেপারে একটি আরশোলাকে জায়গা করে দেবে না, তা আইনজ্ঞদের কথাতেই পরিষ্কার।





