হাত-পা অবশ হওয়া, হতে পারে গুরুতর রোগের লক্ষণ!

হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া একটি সাধারণ সমস্যা মনে হলেও, এটি আসলে অনেক গুরুতর রোগের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। বেশিরভাগ মানুষই এই বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেন না, যা ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই ধরনের অনুভূতির কারণ এবং এর সাথে জড়িত সম্ভাব্য রোগগুলো সম্পর্কে জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
কেন হাত-পা অবশ হয়?
মূলত, হাত বা কব্জির কোনো একটি স্নায়ু বা একগুচ্ছ স্নায়ু সংকুচিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাত অবশ হওয়ার অনুভূতি হয়। এছাড়াও, ডায়াবেটিস, আঘাত, সংক্রমণ বা বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শের কারণে পেরিফেরাল স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হাত অবশ হতে পারে।
অন্যদিকে, পায়ের পাতা অবশ হওয়ার ক্ষেত্রে জ্বালাপোড়া বা সুঁই দিয়ে খোঁচানোর মতো অনুভূতি হতে পারে। মেরুদণ্ডের নিচের অংশের স্নায়ুমূলে যন্ত্রণা হলে এমনটা ঘটে। সাধারণত, এই অনুভূতিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে বা সরাসরি হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কম সময় স্থায়ী হয়।
যদি দীর্ঘক্ষণ হাতের উপর ভর দিয়ে ঘুমান, পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকেন বা নড়াচড়া না করে বসে থাকেন, তাহলে হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি হওয়া স্বাভাবিক। তবে, যদি এই অনুভূতি বারবার হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এটি জটিল কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
যেসব মারাত্মক রোগের লক্ষণ হতে পারে হাত-পা অবশ হওয়া:
ডায়াবেটিস: ডায়াবেটিস পেরিফেরাল স্নায়ু রোগের একটি সাধারণ কারণ। এর ফলে পায়ের পাতা অবশ হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়, যা ধীরে ধীরে উপরের দিকে ছড়াতে থাকে।
সিস্টেমিক ডিজিজ: কিডনি রোগ, ভাস্কুলার ডিজিজ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী টিউমার যা স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করে—এই রোগগুলো সিস্টেমিক ডিজিজের অন্তর্ভুক্ত। এসব ক্ষেত্রেও হাত-পা অবশ হওয়ার সম্পর্ক বিদ্যমান।
মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস: প্রাথমিক অবস্থায় অবশ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি হালকা থাকলেও ঘন ঘন এমন হলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এর ফলে ভারসাম্যের উপর প্রভাব পড়ে, মাথা ঘোরায় এবং ক্লান্তি ভর করে।
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ: এই রোগে মস্তিষ্ক, বাহু ও দেহের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীতে প্লাক জমে। ফ্যাট, ক্যালসিয়াম, ফাইবারাস টিস্যু এবং কোলেস্টেরলের কারণে এই প্লাক তৈরি হয়। চিকিৎসা না করা হলে প্লাক জমে ধমনীর পথ সরু করে দেয়, যা পায়ের উপর প্রভাব ফেলে এবং সংক্রমনের ঝুঁকি বাড়ায়।
টারসাল টানেল সিনড্রোম: পায়ের পাতার পেছনের অংশে গোড়ালির ভেতরের দিকে এই টানেল থাকে। গোড়ালির ভেতরের দিকের টিবিয়াল স্নায়ুর সংকোচনের ফলে এমনটা হয়। চিকিৎসা না করা হলে গোড়ালির অসাড়তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
কারপাল টানেল সিনড্রোম: কব্জির মিডিয়ান স্নায়ুতে চাপ পড়ার ফলে কারপাল টানেল সিনড্রোম হয়। এই স্নায়ুটি হাতের তালু এবং প্রথম তিনটি আঙ্গুলের অনুভূতি ও নড়াচড়ায় সাহায্য করে।
নিউরালজিয়া: স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে তীব্র ব্যথা এবং জ্বালাপোড়ার অনুভূতি হতে দেখা যায়। শরীরের যেকোনো স্থানেই এই রোগ হতে পারে, বিশেষ করে সংক্রমণ এবং বয়সের কারণে এটি দেখা যায়।
স্ট্রোক: হৃদপিণ্ডে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ না হলে স্ট্রোক হয়, বিশেষ করে রক্তনালীতে ব্লকেজ হলে এমনটি ঘটে। স্ট্রোকের প্রথম লক্ষণগুলির মধ্যে বাম হাত অবশ হওয়া অন্যতম, যা হাতের তালু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ করে দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, কথা বলায় সমস্যা এবং হাত, মুখ ও পা অবশ হয়ে যাওয়া স্ট্রোকের অন্যান্য লক্ষণ।
লাইম ডিজিজ: এটি একটি পতঙ্গবাহিত ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রাথমিক লক্ষণ ক্লান্তি, জ্বর, পেশী ও জয়েন্টের ব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া। সময় মতো চিকিৎসা না হলে স্নায়ুর জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়।
ফাইব্রোমায়ালজিয়া: এটি মস্তিষ্কের এমন এক ধরনের সমস্যা যা হলে পেশীতে ব্যথা, স্মৃতির সমস্যা এবং মেজাজ পরিবর্তনের সমস্যা হয়। হাত এবং পা অবশ হয়ে যাওয়া এই রোগের একটি সাধারণ কারণ।