যোগা শুধু শরীর নয়, হৃদয়েরও বন্ধু!

অনেকেরই ধারণা, সুস্থ হৃদয়ের জন্য সপ্তাহে পাঁচ দিন অন্তত ৩০ মিনিট করে দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সাঁতার বা সাইকেল চালানোর মতো ব্যায়াম করাই যথেষ্ট। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা অন্য কথা বলছে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, নিয়মিত মাঝারি ব্যায়ামের পাশাপাশি প্রতিদিন ২০ মিনিট যোগা, প্রাণায়াম ও ধ্যান করলে হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো ইসকিমিক হৃদরোগের কারণগুলোকেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিভিন্ন গবেষণাপত্রে এর স্বপক্ষে জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইউরোপিয়ান জার্নাল অব কার্ডিওভাসকুলার নার্সিং-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের রোগীরা যদি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী সপ্তাহে মাত্র ৩০ মিনিট হালকা যোগা করেন, তবে ১২ সপ্তাহের মধ্যেই তাদের হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ স্থিতিশীল হয়। পাশাপাশি, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে এবং জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়।
অন্যদিকে, ইসকিমিক হৃদরোগের একটি প্রধান কারণ হলো নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন। ‘অল্টারনেটিভ থেরাপিস ইন হেলথ অ্যান্ড মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত দু’দিন যোগা করলে দশ সপ্তাহের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি কর্মঠ ও নিয়মনিষ্ঠ হন এবং তাদের হৃদরোগের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাতেও যোগা ও প্রাণায়াম অত্যন্ত কার্যকরী বলে জানা গেছে। ‘আমেরিকান জার্নাল অব হাইপারটেনশন’-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রায় আট সপ্তাহ যোগা ও প্রাণায়াম করার পরই উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ কমতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ হিসেবে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানসিক চাপ কমানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই গবেষণায় ৪০ জন হৃদরোগীকে তাদের চিকিৎসার পাশাপাশি ৮-১০ সপ্তাহে ১৬ বার যোগা করানো হয়। ফলস্বরূপ, অন্যান্য উন্নতির সাথে সাথে তাদের শ্বাসকষ্ট প্রায় ২২ শতাংশ কমে যায়। এই গবেষণাটি ‘মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্স ইন স্পোর্টস অ্যান্ড এক্সারসাইজ’ জার্নালেও প্রকাশিত হয়েছে।
‘জার্নাল অফ অ্যামেরিকান কলেজ অফ কার্ডিওলজি’-তে প্রকাশিত প্রাথমিক গবেষণা থেকে জানা যায়, অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন নামক মারাত্মক অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের সমস্যা, যা থেকে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, তার প্রকোপও নিয়মিত যোগা করলে কমতে পারে। যদিও এই তত্ত্বকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন, তবে যোগার মাধ্যমে কিছুটা উন্নতি যে সম্ভব, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। ৪৯ জন অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের রোগীকে যোগা করানোর পর তাদের রক্তচাপ ও হার্টরেট কিছুটা কমেছে এবং নিয়মিত অভ্যাসের ফলে ঝুঁকির সম্ভাবনা প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে বলে জানা যায়।
তবে হৃদরোগ, অতিরিক্ত মেদ, ডায়াবেটিস বা মারাত্মক উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা থাকলে যোগা শুরু করার আগে অবশ্যই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ যোগা প্রশিক্ষকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং ব্যথা-বেদনা present থাকলে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করে যোগা করলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তাই যোগাকে সুস্থ জীবনের সঙ্গী করার আগে বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া অপরিহার্য।