মোবাইল আসক্তি: সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকরা

বর্তমান সময়ে ছেলে-মেয়েদের মোবাইল ফোন, ট্যাব বা কম্পিউটার ব্যবহারের প্রতি আসক্তি অভিভাবকদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, সন্তানের প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বাবা-মায়েরা যথেষ্ট বেগ পাচ্ছেন।
ইউরোপের সাত হাজার বাবা-মায়ের ওপর চালানো এক জরিপে উঠে এসেছে যে, তাদের অন্তত ৪৩ শতাংশ মনে করেন, মোবাইল বা ট্যাবলেটের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে তাদের সন্তানদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে।
অন্যদিকে, ৩৮ শতাংশ অভিভাবকের আশঙ্কা, এই ডিভাইসগুলো শিশুদের সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও, ৩২ শতাংশ বাবা-মা তাদের সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন।
তবে, জরিপে অংশগ্রহণকারী অনেকেই মনে করেন, বাবা-মায়েরা নিজেরাই বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্তানদের জন্য একটি খারাপ উদাহরণ তৈরি করছেন।
প্রযুক্তি প্রজন্ম:
ইন্টারনেট ভিত্তিক নিরাপত্তা সংস্থা নর্টন-এর এই জরিপটি মূলত পাঁচ থেকে ১৬ বছর বয়সী ছেলে-মেয়ে এবং তাদের বাবা-মায়ের গ্যাজেট ব্যবহারের অভ্যাস এবং স্ক্রিনে কাটানো সময়কাল জানার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছিল।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, শিশুরা এমনকি চিনি বা মিষ্টির চেয়েও গ্যাজেটের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে বেশি পছন্দ করে। ব্রিটিশ শিশুরা বাইরে খেলাধুলার চেয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাতে বেশি আগ্রহী। দেশটির প্রায় এক চতুর্থাংশ শিশু (২৩ শতাংশ) সবসময় অনলাইনে থাকে, যা তাদের বাবা-মায়ের চেয়েও বেশি।
অভিভাবকরা কী করতে পারেন:
সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:
১) বাড়িতে নিয়ম চালু করে সময় বেঁধে দিতে হবে, যাতে শিশুরা একটি নির্দিষ্ট সময়ের বেশি মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করতে না পারে।
২) অনলাইন বা ইন্টারনেটে শিশুরা কী কী দেখতে পারবে, সে বিষয়ে তাদের বুঝিয়ে বলতে হবে।
৩) অনলাইন সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বন্ধুদের সঙ্গে সুস্থ যোগাযোগের জন্য তাদের উৎসাহিত করতে হবে।
৪) শিশুদের শেখাতে হবে, কোনো কিছুতে ক্লিক করার আগে যেন তারা ভেবে দেখে যে সেটি কী হতে পারে।
৫) অপ্রয়োজনীয় এবং অযাচিত বিষয় দেখা সীমিত করতে প্রযুক্তিগত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
৬) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি এবং ভিডিও পোস্ট করার ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে।
৭) সর্বোপরি, সন্তানের জন্য এক্ষেত্রে নিজেদের একটি ভালো উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ব্রিটিশ শিশু দিনে গড়ে অন্তত তিন ঘণ্টা সময় স্ক্রিনে কাটায়। নর্টন ইউরোপের জেনারেল ম্যানেজার নিক স-এর মতে, আধুনিক সময়ে সন্তান লালন-পালন মোটেও সহজ নয়।
তিনি বলেন, এক সময়ে বাবা-মায়ের প্রধান কাজ ছিল শিশুরা ঠিকমতো শাকসবজি খাচ্ছে কিনা, সময়মতো ঘুমাতে যাচ্ছে কিনা এবং স্কুলের পড়া ঠিকঠাক করছে কিনা, তা দেখা। কিন্তু এখন প্রযুক্তির তদারকি এই সময়ের পিতামাতাদের কাজের একটি অতিরিক্ত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে নিক স এও জানান, কিছু বাবা-মায়ের ধারণা অবশ্য ভিন্ন। তারা মনে করেন, প্রযুক্তি তাদের সন্তানদের বিভিন্নভাবে উপকার করছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রায় ৬০ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন প্রযুক্তি তাদের ছেলে-মেয়েদের বিভিন্ন বিষয় শিখতে সাহায্য করছে এবং প্রায় ৫৩ শতাংশের ধারণা এটি তাদের সন্তানদের আনন্দিত রাখছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, নয় শতাংশ বাবা-মা তাদের সন্তানদের গ্যাজেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মকানুন নির্ধারণ করেননি এবং ৬৫ শতাংশ তাদের বাচ্চাদের শোবার ঘরেও এসব ডিভাইস ব্যবহার করতে দেন। ৪৯ শতাংশ অভিভাবক প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করতে চাইলেও, তারা জানেন না সেটি কীভাবে করতে হয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৩ শতাংশ বাবা-মা দুঃখের সঙ্গে জানান, তারা শিশুদের জন্য যে নিয়ম তৈরি করেছেন, নিজেরাই তা মেনে চলতে পারেন না।
সিক স বলেন, ‘আমরা নিজেরা কতটা সময় অনলাইনে কাটাই এবং কতটা সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকি, তা বিবেচনা করেই সন্তানদের জন্য নিজেদের ভালো উদাহরণ তৈরি করতে হবে।’
তিনি আরও জানান, জরিপে অংশ নেওয়া অন্তত ৫৮ শতাংশ বাবা-মা এখন ‘টেক ফ্রি’ সময় বা দিন কাটান, যখন পরিবারের সবাই তাদের গ্যাজেট দূরে সরিয়ে রাখে।