জ্ঞানেশ কুমারকে সরাতে কি সত্যি সফল হবে বিরোধীরা? জেনে নিন কি বলছে সংবিধান

সম্প্রতি একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ঝড়। কাঠগড়ায় খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত করে তুলেছে বিরোধী শিবির। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নির্দিষ্ট সময়সীমা বাঁধার পাশাপাশি সংসদের প্রস্তাবিত বিশেষ অধিবেশনের আগে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এভাবে পদ থেকে সরানো সম্ভব? আর এই প্রক্রিয়াই বা কতটা দীর্ঘ ও জটিল?
কী বলছে সংবিধান? সিইসি অপসারণের কড়া বিধি: সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতিকে যেভাবে পদ থেকে অপসারণ করা হয়, ঠিক একইরকম কঠোর এবং জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরাতে হয়। তবে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি কিছুটা আলাদা; তাঁদের রাষ্ট্রপতি সরাতে পারলেও তার জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ বাধ্যতামূলক।
ইমপিচমেন্ট বা অপসারণের এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
প্রথম ধাপ (নোটিশ জমা): প্রক্রিয়া শুরু করতে হলে লোকসভার স্পিকার বা রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত নোটিশ জমা দিতে হয়। এর জন্য লোকসভায় অন্তত ১০০ জন এবং রাজ্যসভায় অন্তত ৫০ জন সাংসদের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়।
দ্বিতীয় ধাপ (তদন্ত কমিটি গঠন): স্পিকার বা চেয়ারম্যান অভিযোগের ভিত্তি খতিয়ে দেখে নোটিশ গ্রহণ করলে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং একজন বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।
তৃতীয় ধাপ (সংসদে বিতর্ক ও ভোটাভুটি): কমিটি তদন্তের পর রিপোর্ট সংসদে পেশ করার পর তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। অভিযুক্ত সিইসি-কে নিজের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগও দেওয়া হতে পারে। এরপর লোকসভা ও রাজ্যসভা—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ বা বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোটে প্রস্তাবটি পাশ হতে হয়। উভয় কক্ষে পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদনেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়।
ইতিহাসের পাতা ও বিরোধীদের পরবর্তী চাল: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনো মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে এই প্রক্রিয়ায় পদ থেকে অপসারণ করা হয়নি। এর আগেও চলতি বছরের মার্চ মাসে জ্ঞানেশ কুমারকে সরাতে লোকসভা ও রাজ্যসভায় যথাক্রমে ১৩০ এবং ৬৩ জন সাংসদের সই সম্বলিত নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ৬ এপ্রিল খারিজ হয়ে যায়। এমনকি রাজ্যসভায় বিচারাধীন রয়েছে আরেকটি নোটিশও।
এহেন পরিস্থিতিতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকেই জ্ঞানেশ কুমারকে হটানোর পরবর্তী যৌথ রাজনৈতিক কৌশল এবং ইমপিচমেন্টের রূপরেখা চূড়ান্ত হতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।