বিয়ের আগে রক্তের গ্রুপ জানুন, সুরক্ষিত রাখুন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম!

বিয়ের আগে আমরা সাধারণত পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, ঘরবাড়ি ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে থাকি। তবে স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অনেক সময়ই আমরা ভুলে যাই। অথচ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতার জন্য বিয়ের আগে স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য জেনে রাখা অপরিহার্য।
স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ কেমন হওয়া উচিত?
এই বিষয়ে আলোচনার আগে রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা থাকা দরকার। রক্তের গ্রুপকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১. ABO সিস্টেম: A, B, AB এবং O এই চারটি প্রধান গ্রুপের সমন্বয়ে গঠিত।
২. Rh ফ্যাক্টর: Rh পজিটিভ (+ve) এবং Rh নেগেটিভ (-ve)। এই ফ্যাক্টর নির্ধারণ করে রক্তের গ্রুপ পজিটিভ হবে নাকি নেগেটিভ।
সুতরাং, রক্তের গ্রুপগুলো হলো: A+ve, A-ve, B+ve, B-ve, AB+ve, AB-ve, O+ve, O-ve।
যদি অন্য গ্রুপের রক্ত কারো শরীরে দেওয়া হয় তাহলে কী হবে?
যখন কোনো Rh নেগেটিভ গ্রুপের ব্যক্তিকে Rh পজিটিভ গ্রুপের রক্ত দেওয়া হয়, তখন প্রথমবার সাধারণত তেমন কিছু হয় না। কিন্তু এর বিরুদ্ধে রোগীর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ফলে পরবর্তীতে যদি সেই রোগী আবার পজিটিভ রক্ত নেয়, তাহলে তার রক্তকোষগুলো ভেঙে যাবে। এর কারণে জ্বর, কিডনি ফেইলিউর, এমনকি হঠাৎ মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এই সমস্যাটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ABO incompatibility বলা হয়।
স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ কী রকম হওয়া দরকার?
সহজভাবে বলতে গেলে, স্বামীর রক্তের গ্রুপ যদি পজিটিভ হয়, তাহলে স্ত্রীর রক্তের গ্রুপও পজিটিভ হওয়া উচিত। আর যদি স্বামীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হয়, তাহলে স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ পজিটিভ বা নেগেটিভ যেকোনো একটি হলেই চলবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বামীর রক্তের গ্রুপ যদি পজিটিভ হয়, তাহলে কোনোভাবেই স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হওয়া উচিত নয়। যদি স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হয়, তাহলে তার স্বামীর রক্তের গ্রুপও নেগেটিভ হতে হবে।
যদি স্বামীর রক্তের গ্রুপ পজিটিভ হয় আর স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হয় তাহলে কী সমস্যা হবে?
রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে সাধারণত কোনো সমস্যা হয় না। তবে স্ত্রী যদি Rh নেগেটিভ হন এবং স্বামী যদি Rh পজিটিভ হন, তাহলে গর্ভধারণের সময় ‘লিথাল জিন’ বা ‘মারন জিন’ নামে একটি জিন তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তীতে জাইগোট (নিষিক্ত ডিম্বাণু) তৈরিতে বাধা দেয় বা জাইগোটকে মেরে ফেলে। এর ফলে মৃত বাচ্চা জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
যদি স্বামীর রক্তের গ্রুপ পজিটিভ হয়, তাহলে সাধারণত বাচ্চার রক্তের গ্রুপও পজিটিভ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যখন কোনো নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের মা পজিটিভ ফিটাস (ভ্রূণ) ধারণ করেন, তখন প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু ডেলিভারির সময় পজিটিভ ফিটাসের রক্ত প্ল্যাসেন্টাল ব্যারিয়ার (গর্ভফুল) ভেদ করে এবং প্ল্যাসেন্টাল ডিসপ্লেসমেন্টের সময় মায়ের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
মায়ের শরীরে ডেলিভারির সময় যে রক্ত প্রবেশ করে, তা ডেলিভারি হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই মায়ের শরীরে Rh অ্যান্টিবডি তৈরি করে। যখন মা দ্বিতীয় সন্তান ধারণ করবেন, তখন যদি তার ফিটাসের রক্তের গ্রুপ পুনরায় পজিটিভ হয়, তাহলে মায়ের শরীরে আগে তৈরি হওয়া Rh অ্যান্টিবডি প্ল্যাসেন্টাল ব্যারিয়ার ভেদ করে বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করবে। আর যখন ফিটাসের শরীরে Rh অ্যান্টিবডি প্রবেশ করবে, তখন ফিটাসের লোহিত রক্তকণিকার (RBC) সাথে অ্যাগ্লুটিনেশন (জমাট বাঁধা) হবে, যার ফলে RBC ভেঙে যাবে। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় “Rh incompatibility” বলে।
শেষ কথা:
বর্তমানে Rh নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের মহিলাদের ক্ষেত্রে খুব বেশি সমস্যা হয় না, যদি আগে কখনো অ্যাবরশন না হয়ে থাকে। শুধু সচেতন থাকতে হবে। স্বামীর রক্তের গ্রুপ পজিটিভ হলে, বাচ্চার জন্মের পরপরই বাচ্চার রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করতে হবে। যদি বাচ্চার রক্তের গ্রুপ মায়ের মতো নেগেটিভ হয়, তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। আর যদি পজিটিভ হয়, তবে ডেলিভারির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মাকে অ্যান্টি-ডি ইনজেকশন নিতে হবে। যদি আগে কখনো অ্যাবরশন হয়ে থাকে এবং তখন অ্যান্টি-ডি ইনজেকশন না নেওয়া হয়ে থাকে, তবে পরবর্তীকালে সমস্যা হতে পারে যদি সেই বাচ্চার পিতা পজিটিভ রক্তের গ্রুপের হন। সুতরাং, আগে অ্যাবরশন হওয়ার পর ইনজেকশন না নিলে নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের কোনো পুরুষকে বিয়ে করা শ্রেয়।
বিয়ের আগে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করানো কেবল একটি সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা নয়, এটি আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই এই বিষয়ে সচেতন হোন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।