বিপদে মানুষকে সাহায্য না করে অনেকে ভিডিও কেন করেন? জেনেনিন সেই কারণ

রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা, রক্তারক্তি মারামারি কিংবা জীবনমৃত্যুর লড়াই—চোখের সামনে এমন ভয়ানক দৃশ্য দেখলেই অনেকেরই প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে ভিডিও করা। মুমূর্ষু ব্যক্তিকে উদ্ধারের চেষ্টা করার বদলে ক্যামেরা অন করে পুরো ঘটনাটি ধারণ করার এই প্রবণতা আজকাল আকছারই দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিপদের মুহূর্তে মানুষ এমন অমানবিক বা অদ্ভুত আচরণ কেন করেন? এর নেপথ্যে কি শুধুই কৌতূহল, নাকি কাজ করছে সুগভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এতটাই অঙ্গ হয়ে গেছে যে ভালো-মন্দের তফাত না বুঝেই আঙুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যামেরার দিকে চলে যায়। যুগ যুগ ধরে মানুষ যা চোখে দেখে পরে মুখে বলত, আজ তার জায়গা নিয়েছে ভিডিও রেকর্ডিং। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব। লাইক, শেয়ার, কমেন্ট বা ভাইরাল হওয়ার ইঁদুরদৌড়ে অনেকেই মনে করেন, ‘সবার আগে এই দৃশ্য রেকর্ড করে রাখতেই হবে।’ কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ক্ষেত্রে এই মানসিকতা আরও বেশি মাত্রায় প্রকট হয়।

তবে এর পেছনে কেবল খ্যাতি পাওয়ার লোভ নয়, কাজ করে মানুষের সহজাত কৌতূহলও। আকস্মিক ও অস্বাভাবিক ঘটনার আকর্ষণে মানুষ স্বভাবতই সেটির গভীরে পৌঁছাতে চায়। পাশাপাশি, হঠাৎ কোনো মারাত্মক দৃশ্য দেখলে মস্তিষ্কে তীব্র আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যার ফলে মানুষ সাময়িকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইমোশনাল নাম্বনেস’ বা আবেগগত অবশতা। সঠিক প্রতিক্রিয়া কী হবে বুঝে উঠতে না পেরে অনেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে ভিডিও করাকেই একমাত্র কাজ বলে মনে করেন।

এ ছাড়াও ভিড়ের মধ্যে কাজ করে ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’ (Bystander Effect)। অর্থাৎ আশপাশে অনেক মানুষ থাকলে প্রত্যেকেই ধরে নেন যে অন্য কেউ নিশ্চয়ই সাহায্য করতে এগিয়ে আসবেন, যার ফলে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ মারাত্মকভাবে কমে যায়। যদিও অনেক সময় এই ভিডিওগুলো আইনি তদন্ত বা অপরাধ প্রমাণে সাহায্য করে, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—ভিডিওর চেয়ে কি একটি মানুষের জীবন কম দামি? প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীকে ক্যামেরাবন্দি করার ক্ষমতা দিলেও, মানুষের বিপদের মুহূর্তে ক্যামেরা বন্ধ রেখে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মানবিকতাই সমাজকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।