বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি কমবেই, এমন ধারণা ভুল! মস্তিষ্ককে সতেজ রাখার ৭টি কৌশল

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে শুরু করে। এমনকি যুক্তি দেওয়ার ক্ষমতাও নাকি কমে আসে। তবে এই ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। আশার কথা হলো, সঠিক চর্চার মাধ্যমে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ানোর কিছু কার্যকর মানসিক চর্চা ও কৌশলের কথা তুলে ধরা হয়েছে। আসুন, সেই পদ্ধতিগুলো জেনে নেওয়া যাক:
১. ব্যায়াম:
বিশ্বাস করুন বা না করুন, শরীরচর্চা আমাদের মস্তিষ্কের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যায়ামের ফলে মস্তিষ্কের সিন্যাপসিস (যেখানে দুটি নিউরনের মধ্যে স্নায়বিক সংকেত আদান-প্রদান হয়) বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মস্তিষ্কে আরও বেশি যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং নতুন কোষ তৈরি হয়।
হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকার অর্থ হলো আপনি শরীরে আরও বেশি অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারবেন এবং ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দিতে পারবেন। আর যদি খোলা জায়গায় ব্যায়াম করেন, তবে সূর্যের আলো থেকে ভিটামিন ডি গ্রহণ আপনার মস্তিষ্কের জন্য আরও উপকারী।
ব্যায়াম করার সময় নতুন পরিবেশে ঘুরে দেখুন। এতে অন্যদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং নতুন কিছু শেখার সুযোগ তৈরি হয়। এটি মস্তিষ্কের নতুন কোষগুলোর জন্য একটি নতুন সার্কিট তৈরি করতে সহায়ক।
২. চলতি পথে মুখস্থ করা:
বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, হাঁটার সময় নতুন কিছু মুখস্থ করার অভ্যাস অত্যন্ত কার্যকর। অভিনেতারাও এই কৌশলটি ব্যবহার করেন।
বলা হয়, চলার পথে নতুন কোনো শব্দ বা তথ্য শেখার চেষ্টা করলে তা সহজে মনে থাকে। ভবিষ্যতে কোনো প্রেজেন্টেশন বা বক্তব্য দেওয়ার থাকলে, হাঁটতে হাঁটতে সেটি পড়ে দেখতে পারেন। এমনকি মস্তিষ্ককে তথ্য ধরে রাখতে সাহায্য করার জন্য হালকা নাচানাচিও করতে পারেন!
৩. সঠিক খাবার খান:
আমরা যে পরিমাণ শক্তি ও গ্লুকোজ গ্রহণ করি, তার প্রায় ২০ শতাংশ সরাসরি মস্তিষ্কে যায়। তাই মস্তিষ্কের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে শরীরে গ্লুকোজের সঠিক মাত্রার ওপর।
শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মন ও মস্তিষ্ক ঝাপসা লাগতে পারে। পছন্দের খাবার খেলে মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা আমাদের শান্তি এনে দেয়।
তবে শুধু মস্তিষ্কের ক্ষুধা মেটালেই চলবে না, পেটের ক্ষুধা মেটানোও জরুরি। কারণ পেটকে ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলা হয়। স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমকে ঠিক রাখে এবং মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখে।
মস্তিষ্কের কোষ চর্বি দিয়ে গঠিত। তাই খাবার থেকে চর্বি একেবারে বাদ দেওয়া উচিত নয়। বিভিন্ন বাদাম, বীজ, অ্যাভোকাডো, মাছ, রোজমেরি ও হলুদ থেকে প্রাপ্ত ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারী।
একই সঙ্গে চেষ্টা করুন একা একা না খেয়ে অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে খেতে। সামাজিকতা মস্তিষ্কে স্বাস্থ্যকর খাবারের উপকারিতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
৪. বিরতি নিন:
কিছু পরিমাণে চাপ বা স্ট্রেস থাকা আমাদের জন্য দরকারি, কারণ এটি জরুরি অবস্থায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহায্য করে। এটি কর্টিসল নামক হরমোনের ক্ষরণকে উদ্দীপিত করে, যা সাময়িকভাবে আমাদের সজাগ করে তোলে এবং মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা এবং অতিরিক্ত চাপ মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। তাই সময়মতো বিরতি নেওয়া এবং মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়া জরুরি।
সবকিছু থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিরতি নেওয়ার অর্থ হলো, আপনি আপনার মস্তিষ্কের ভিন্ন একটি অংশ ব্যবহার করছেন। মস্তিষ্কে স্বাভাবিকভাবে একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক থাকে, যা মানুষকে কল্পনা করার ক্ষমতা বা দিবা স্বপ্ন দেখার সক্ষমতা দেয়। স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিরতি নেওয়ার মাধ্যমে আমরা মস্তিষ্কের এই অংশকে সক্রিয় করি এবং কাজ করার সুযোগ করে দেই। যদি সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং মস্তিষ্ককে শান্ত করা কঠিন মনে হয়, তাহলে ধ্যান করার মতো পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। ধ্যান স্ট্রেস হরমোনের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়ক।
৫. নতুন চ্যালেঞ্জ নিন:
মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ানোর একটি চমৎকার উপায় হলো একে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ দেওয়া, যেমন নতুন কিছু শেখা। আর্ট ক্লাসে অংশ নেওয়া বা নতুন কোনো ভাষা শেখার মতো কাজ মস্তিষ্কের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়।
এর অংশ হিসেবে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে মিলে কোনো গেম বা চ্যালেঞ্জ শুরু করতে পারেন। এটি শুধু আপনার জন্য একটি চ্যালেঞ্জই হবে না, অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সামাজিক মিথষ্ক্রিয়াও বাড়বে। সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা মস্তিষ্কের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
৬. গান শুনুন:
সঙ্গীত মস্তিষ্ককে অসাধারণভাবে উদ্দীপিত করে। গান শোনার সময় বা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর সময় মস্তিষ্কের চিত্র দেখলে বোঝা যায় যে, মস্তিষ্কের প্রায় প্রতিটি অংশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
গান সাধারণ বোধশক্তি ও স্মৃতিকে শক্তিশালী করে। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীরাও শেষ পর্যন্ত গানের স্মৃতি ধরে রাখতে পারেন। তাই নিজে গান করুন বা গান শুনুন।
৭. পড়া এবং ঘুম:
দিনের বেলায় যখন আপনি নতুন কিছু পড়েন, তখন মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি হয়। আর যখন আপনি ঘুমান, তখন সেই সংযোগ আরও শক্তিশালী হয় এবং শেখা তথ্য স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়। এ কারণে স্মৃতিশক্তির জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং, বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি কমবেই – এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। সঠিক মানসিক চর্চা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি আপনার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে এবং এমনকি উন্নত করতেও পারেন। এই সহজ কৌশলগুলো অবলম্বন করে আপনার মস্তিষ্ককে সতেজ ও কর্মক্ষম রাখুন।