পুরুষের জন্য মারাত্মক মেলানোমা, কেন নারীদের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পুরুষরা?

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ত্বকের ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ত্বকের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে এই ক্যান্সার হয়, যার প্রধান কারণ ধরা হয় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, শরীরের যেসব অংশে সূর্যের আলো পড়ে না, সেখানেও ত্বকের ক্যান্সার দেখা দিতে পারে। ত্বকের ক্যান্সারের তিনটি প্রধান প্রকার হলো বেসাল সেল কার্সিনোমা, স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা এবং মেলানোমা।
এদের মধ্যে মেলানোমা সবচেয়ে আক্রমণাত্মক এবং প্রাণঘাতী। অবাক করা তথ্য হলো, নারীদের চেয়ে পুরুষদের মধ্যে মেলানোমা ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি এবং এতে মৃত্যুর হারও পুরুষদের মধ্যেই বেশি।
রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (CDC) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের মেলানোমায় মারা যাওয়ার ঝুঁকি নারীদের চেয়ে বেশি। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৭,৬৯৮ জন নতুন করে মেলানোমা ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে ৪৫,৮৫৪ জন পুরুষ এবং ৩১,৮৪৫ জন নারী। শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের মধ্যে ত্বকের ক্যান্সারের হার সর্বোচ্চ (প্রতি ১ লাখে ৩৪.৯ জন), যেখানে কালো নারীদের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন (প্রতি ১ লাখে ০.৯ জন)। বিস্ময়করভাবে, নারীদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি পুরুষ মেলানোমা ক্যান্সারে মারা যান।
পুরুষদের মেলানোমার ঝুঁকি বেশি হওয়ার কারণ কী?
বিশেষজ্ঞরা পুরুষদের মধ্যে মেলানোমার ঝুঁকি বেশি হওয়ার সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত না হলেও, বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন:
সূর্য থেকে সুরক্ষা কম: ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এক চতুর্থাংশেরও কম পুরুষ নিজেদের সূর্য থেকে রক্ষা করেন। এমনকি এক চতুর্থাংশ পুরুষ জানিয়েছেন যে তারা সূর্য থেকে সুরক্ষিত থাকার বিষয়ে কোনো নিয়মই মানেন না।
সানস্ক্রিন ব্যবহারে অনীহা: আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি জার্নালের একটি গবেষণা অনুসারে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন। পুরুষদের সানস্ক্রিন কম ব্যবহারের প্রবণতা মেলানোমা ক্যান্সারের উচ্চ হারের একটি কারণ হতে পারে।
শারীরিক গঠনগত পার্থক্য: পুরুষদের ত্বকের নিচে চর্বির পরিমাণ কম থাকে এবং তাদের ত্বক তুলনামূলকভাবে ঘন হয়। অন্যদিকে, নারীদের ত্বকে কোলাজেনের পরিমাণ বেশি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, একই পরিমাণ ইউভি সূর্যালোক নারীদের তুলনায় পুরুষদের ত্বককে বেশি ক্ষতি করে।
হরমোনের প্রভাব: গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, উচ্চতর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা মেলানোমার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ কারণে নারীদের মধ্যে ত্বকের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার কম। বিজ্ঞানীরা আরও লক্ষ্য করেছেন যে, স্থূল পুরুষদের মধ্যেও উচ্চ মাত্রার ইস্ট্রোজেন থাকার ঝুঁকি থাকতে পারে।
কখন সতর্ক হবেন?
ত্বকের ক্যান্সারের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সুস্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। তবে ত্বকে অস্বাভাবিক তিল বা দাগ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। পুরুষদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মেলানোমা কাঁধ বা পিঠের মতো স্থানে দেখা যায়।
যদি এমন কোনো তিল বা দাগ সময়ের সাথে সাথে বড় হয়, তার আকার বা রঙ পরিবর্তিত হয়, চুলকানি হয়, ব্যথা করে বা রক্তপাত ঘটে, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ত্বকের ক্যান্সারে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীই ত্বকের ক্ষতস্থানে আলসার বা রক্তপাত শুরু হওয়ার পরই চিকিৎসকের কাছে যান, যা প্রায়শই খুব দেরি হয়ে যায় এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
সুতরাং, ত্বকের যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন। আপনার ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে রক্ষা করুন এবং নিয়মিত ত্বকের পরীক্ষা করান।