কোনটা স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া, আর কোনটা অ্যালজাইমার্সের লক্ষণ? জানুন

অ্যালজাইমার্স রোগ ও সহযোগী স্মৃতিভ্রংশতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব অ্যালজাইমার্স দিবস পালিত হয়। এই রোগ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা হ্রাস করে, যার ফলে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যায়। অ্যালজাইমার্সে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিনের পরিচিত বন্ধু, ঠিকানা এমনকি রাস্তার নামও ভুলে যেতে পারেন।
তবে বয়সের কারণে অনেক সময় স্বাভাবিক নিয়মেই স্মৃতিশক্তি কমতে পারে। ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু কীভাবে বুঝবেন কোনটা স্বাভাবিক ডিমেনশিয়ার লক্ষণ আর কোনটা অ্যালজাইমার্সের? আসুন, জেনে নেওয়া যাক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য:
স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া বনাম অ্যালজাইমার্সের লক্ষণ:
নাম ভুলে যাওয়া: কোনো মানুষের নাম ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে। তবে পরিচিত ব্যক্তিকে মনে করতে না পারা স্বাভাবিক ডিমেনশিয়ার লক্ষণ নয়, এটি অ্যালজাইমার্সের ইঙ্গিত হতে পারে।
কিছু ভুলে যাওয়া বনাম প্রয়োজনীয় কাজ ভুলে যাওয়া: মাঝে মাঝে কিছু ভুলে গেলেও যদি সারাদিনের কাজ ঠিকঠাক করতে পারেন, তাহলে আপনি স্বাভাবিক ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। কিন্তু রোজকার জীবনের প্রয়োজনীয় কাজ, যেমন বিল দিতে ভুলে যাওয়া বা কীভাবে দিতে হবে তা ভুলে যাওয়া অ্যালজাইমারের লক্ষণ।
জিনিসপত্র misplaced করা: অনেক সময় স্বাভাবিক ডিমেনশিয়ার কারণে আমরা প্রয়োজনীয় জিনিস কোথায় রেখেছি তা ভুলে যাই। কিন্তু একেবারেই অপ্রত্যাশিত জায়গায় (যেমন চাবি ফ্রিজে রেখে দেওয়া) জিনিস রাখা বা প্রায়শই হারিয়ে ফেলা অ্যালজাইমারের গুরুতর লক্ষণ।
দিনের ভুল করা বনাম সময় গুলিয়ে ফেলা: আজ কী বার – স্বাভাবিক ডিমেনশিয়ার কারণে অনেক সময়ই আপনি সপ্তাহের দিন ভুল করতে পারেন। কিন্তু যদি তারিখ, ঋতু, সময়ের ধারাবাহিকতা গুলিয়ে যায়, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কথা খুঁজে না পাওয়া বনাম কথার খেই হারানো: কথা বলার সময় অনেক সময়ই সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়। তবে যদি দেখেন আপনার প্রিয়জন কথার খেই রাখতে পারছেন না, এক বক্তব্য থেকে আরেক বক্তব্যে চলে যাচ্ছেন, এই মুহূর্তে বলে পরের মুহূর্তে নিজেই ভুলে যাচ্ছেন, তাহলে বুঝবেন অ্যালজাইমারের লক্ষণ প্রকট হচ্ছে।
রাস্তা ভুল করা বনাম পরিচিত রাস্তা ভুলে যাওয়া: রাস্তায় বেরিয়ে দিক ঠিক করতে না পারার সমস্যা অনেকেরই হতে পারে। কিন্তু পরিচিত রাস্তায় যদি বারবার হারিয়ে যান বা বাড়ির রাস্তা ভুলে যান, তবে আপনি অ্যালজাইমারে আক্রান্ত হতে পারেন।
মেজাজ পরিবর্তন বনাম কারণহীন বিরক্তি: দিনটা নিজের পরিকল্পনা মতো না চললে বা হঠাৎ পরিবর্তন এলে অনেকেই মেজাজ হারাতে পারেন। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া বিরক্ত হওয়া, ভয় পাওয়া, উত্কণ্ঠায় ভোগা বা সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়া অ্যালজাইমারের জোরালো লক্ষণ।
ভুল সিদ্ধান্ত বনাম সিদ্ধান্তহীনতা: মাঝে মাঝে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে না পারা বা দুর্বল বিচারবুদ্ধির পরিচয়ও অ্যালজাইমারের লক্ষণ হতে পারে।
ক্লান্তি বনাম আগ্রহ হারানো: অফিসে বা অনুষ্ঠানে ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা, পছন্দের কাজ করতে ভালো না লাগা মানে আপনার অবশ্যই কোনো সমস্যা হচ্ছে।
অ্যালজাইমারের সঙ্গে যাপন:
অ্যালজাইমারে আক্রান্ত হলে হতাশ না হয়ে পরিবারের ভালোবাসা ও সাহায্য চাওয়া উচিত। নিজের পছন্দের কাজ করা এবং স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা জরুরি। সময়, স্থান ও ব্যক্তির পরিচয় ভুলে যাওয়া এই রোগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাই একটি ডায়রিতে দরকারি কাজ, তারিখ এবং পরিবার-বন্ধুদের নাম-ঠিকানা লিখে রাখা সহায়ক হতে পারে। বই পড়া, খেলাধুলা, ক্রসওয়ার্ড পাজল সমাধান করা বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো অ্যালজাইমারের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে সাহায্য করে। সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে নিজেকে যুক্ত রাখলে মস্তিষ্ক সচল থাকে এবং রোগের মোকাবিলা করা সহজ হয়। মানসিক চাপ ও অবসাদের সঙ্গে সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারলে ইতিবাচক জীবনবোধ তৈরি হয়। নিজের খাওয়া দাওয়া ও শরীরচর্চার উপর জোর দেওয়াও জরুরি।
অ্যালজাইমারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে বসবাস:
আপনার প্রিয়জন যদি অ্যালজাইমারে আক্রান্ত হন, তবে তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আপনার সাহচর্য। কারণ এই রোগের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। আপনার সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার মাধ্যমেই প্রিয়জন ভরসা পেতে পারেন। অ্যালজাইমারে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সবসময় চোখে চোখে রাখা এবং তাদের প্রতি ধৈর্য্য ও ভালোবাসা দেখানো অপরিহার্য। তাদের বিভ্রান্তি ও খিটখিটে মেজাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রতিদিন নতুন কিছু শেখানোর মানসিকতা রাখা প্রয়োজন।