কুড়িতেই বুড়ি? ২৫ পেরোনো অবিবাহিত নারীদের সাতকাহন

নারী পুরুষের সমান অধিকার নিয়ে বার বার বিতর্ক আলোচনা উঠলেও, সমাজের অনেক কিছু বদল ঘটলেও প্রচলিত ধ্যান ধারণা রয়েই গিয়েছে – একটি মেয়ের জীবনের মূল লক্ষ্যই হল যেন বিয়ে৷ কথায় বলে এ সমাজে নারীরা কুড়িতেই বুড়ি। আর এই কথাটি বলার কারণ হলো, ২৫ বছর বয়সের পরেই মেয়েদেরকে বিয়ে করিয়ে দেয়ার জন্য নানান দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়। কোনও মেয়ের বয়স বাড়লেই পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী সকলেই বিয়ের ব্যাপারে এত প্রশ্ন করে যা অনেক সময় চরম বিরক্তিকর হয়ে পড়ে অবিবাহিত মেয়েদের কাছে। এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক ২৫ পেরোন অবিবাহিত মহিলার সমস্যার সাতকাহন৷
প্রথমত বাড়ির ভিতরেই সকালে ঘুম থেকে উঠে টেবিল থেকে রাতে শুতে যাওয়া পর্যন্ত বার বার বাবা-মাকে হা হুতাশ করতে শোনা যায় মেয়ের বিয়ে দিতে মনা পারার জন্য৷ ওদের অমন অবস্থা দেখে নিজেকেই অপরাধী মনে হয় মেয়েদের৷ “কবে তোর একটা ভালো পাত্র জুটবে?”, “আর কতদিন একা থাকবি?”, “আমাদের চোখ বুজবার আগে তোকে সংসারী দেখে যেতে পারলেই শান্তি” – এই ধরনের কথাগুলো যেন রোজকার রুটিন হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত, বাড়ির বাইরে কর্মক্ষেত্রে গেলেই চার পাশে লোকজনের বিয়ের গল্প চলে তখনই আবার আইবুড়ো মেয়েদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় কেন এখনও তার বিয়ে হল না? যা অবশ্যই অস্বস্তির কারণ৷ সহকর্মীদের মধ্যে যখন তাদের স্বামী, সংসার, বাচ্চার কথা হয়, তখন অবিবাহিত মেয়েরা যেন এক ভিন্ন গ্রহের প্রাণী। তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল যেন কিছুতেই থামতে চায় না। “কাজের চাপ তো বুঝলাম, কিন্তু আর একটু চেষ্টা করো, ভালো ছেলে তো অনেক আছে”, এমন উপদেশ যেন বিনা আমন্ত্রণে আসতেই থাকে।
তৃতীয়ত কোনও বিয়ে অথবা অনুষ্ঠান বাড়িতে যাওয়ার উপায় নেই৷ সেখানে মনের আনন্দে সেজে গুজে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করার উপায় নেই৷ সেখানেও শুনতে হচ্ছে সেই একই প্রশ্ন কেন সে এখনও বিয়ে করছে না? উৎসবের আমেজ নিমেষে বিষাদে পরিণত হয় যখন আত্মীয়-স্বজনদের উৎসুক দৃষ্টি আর একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি শুনতে হয়। “এই বুঝি তোমারও বিয়ের সানাই বাজবে”, “এত সুন্দর দেখতে, এখনও একা কেন?” – এই ধরনের মন্তব্য যেন আনন্দের বদলে অস্বস্তি আর চাপা কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
চতুর্থত, বয়স হয়ে কিছুটা অথচ বিয়ে না হওয়ায় কেমন পোশাক পরবেন তা নিয়েও একটা ধন্দ থাকে৷ বেশি জমকালো পোশাক পরলেও কেউ কটাক্ষ করে তো তা না পরার জন্যও কেউ কেউ হাসাহাসি করে থাকেন৷ “এত সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছিস?”, “আর একটু বয়স হলে এসব আর মানাবে না” – এমন কথা শুনতে হয়। আবার সাধারণ পোশাক পরলে বলা হয়, “আর একটু যত্ন নাও নিজের, দেখবে ভালো সম্বন্ধ আসবে।” পোশাক নিয়েও যেন শান্তি নেই অবিবাহিত মেয়েদের জীবনে।
পঞ্চমত বেশি বয়েস হয়ে গেলে কোনও অনুষ্ঠান বাড়িতে গিয়ে আড়ষ্ঠতা থাকে কারণ সমবয়সী এমনকী ছোটরাও যেখানে স্বামীর অথবা বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে সেখানে যাচ্ছে সেখানে তিনি সঙ্গীবিহীন ৷ তখন নিজেকে অনেক অসহায় লাগে । অন্যদের হাসিখুশি দাম্পত্য জীবন দেখে নিজের একাকীত্ব যেন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। মনে হয় যেন সমাজের মূল স্রোত থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন।
ষষ্ঠত, বিয়ে না হওয়া ২৫ ঊর্ধ্ব নারীর নিরাপত্তাও অনেক সময় বিঘ্নিত হয় কারণ এই একা মহিলাদের অনেকেই সহজলোভ্য বলে মনে করে নানা রকম কুপ্রস্তাব দেন৷ এমনকী একা রয়েছেন বলে অনেক পুরুষের শিকার হয়ে যান একা নারীটি৷ সমাজের কিছু কুরুচিপূর্ণ মানুষ одиноких মহিলাদের দুর্বল এবং অসহায় মনে করে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।
সপ্তমত, কোন নারী বিয়ে না করে একা রয়েছেন এজন্য অনেকেই তাঁকে ভাল চোখে দেখেন না এবং ওই অবিবাহিত মহিলা সম্পর্কে মিথ্যা দুর্নাম রটানো হয়৷ “নিশ্চয়ই কোনও সমস্যা আছে”, “না হলে এতদিনে বিয়ে হত না”, “চরিত্র ভালো না”- এমন নানা ধরনের ভিত্তিহীন কথা রটানো হয়। সমাজে একজন অবিবাহিত মহিলাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, যা তার মানসিক শান্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজের এই ধরনের ধ্যান ধারণা কবে বদলাবে আর কবে নারীরা তাদের জীবন নিজেদের শর্তে বাঁচতে পারবে, সেই দিনের অপেক্ষায় আজও অনেক ‘কুড়িতে বুড়ি’ হওয়া মেয়েরা।