নীরব ঘাতক PCOS, মাতৃত্বের ঝুঁকি থেকে ক্যান্সার, অজানা বিপদের মুখে মধ্যবয়সী ও তরুণীরা!

নারীঘটিত রোগগুলোর মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS) বর্তমানে একটি অন্যতম উদ্বেগের কারণ। এই রোগে মধ্যবয়সী নারীরা বেশি আক্রান্ত হলেও, অনেক বিবাহিত তরুণীর ক্ষেত্রেও এটি দেখা যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজাদা সেলিম এই রোগকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছেন। PCOS মূলত নারীদেহে এন্ড্রোজেন (পুরুষ যৌন হরমোন)-এর আধিক্যের কারণে সংঘটিত একটি জটিল শারীরিক সমস্যা, যা অবহেলা করলে সুদূরপ্রসারী মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
PCOS-এর প্রধান উপসর্গ ও ঝুঁকি:
ডা. শাহজাদা সেলিম পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোমের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গের কথা তুলে ধরেছেন:
অনিয়মিত মাসিক: বেশিরভাগ নারীর ক্ষেত্রে ৪০, ৪৫, ৫০ দিন বা তারও বেশি দিন পর ঋতুস্রাব হয়। অনেক সময় ঋতুস্রাব কয়েক মাস বন্ধও থাকতে পারে।
অতিরিক্ত রক্তস্রাব: কারো কারো ক্ষেত্রে অনিয়মিত হলেও অতিরিক্ত রক্তস্রাব হতে পারে।
শরীরে অত্যধিক লোম (পুরুষালি): মুখে ও শরীরের অন্যান্য অংশে পুরুষের মতো লোমের উপস্থিতি (হার্সোটিজম)।
ব্রণ: মুখে ও শরীরের অন্যান্য অংশে ব্রণ হওয়া।
এছাড়াও, PCOS-এর সঙ্গে আরও কিছু শারীরিক সমস্যা যুক্ত হতে পারে, যেমন: তলপেটে ব্যথা, ঘাড়, বগল ইত্যাদি জায়গায় মখমলের মতো কালো ত্বক (Acanthosis Nigricans), এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বন্ধ্যত্ব। সন্তান নিতে ব্যর্থ হওয়া নারীদের একটি বড় অংশের বন্ধ্যত্বের কারণ হলো PCOS-এর কারণে ঋতুচক্রের অনেকগুলোতেই ডিম্বাণুর অনুপস্থিতি।
গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি:
PCOS আক্রান্ত রোগীদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এদের অনেকেই দৈহিক স্থূলতায় (Obesity) আক্রান্ত হন, যা নাকডাকা ও ঘুমের সময় হঠাৎ করে শ্বাস বন্ধ হওয়ার (Sleep Apnea) মতো সমস্যা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকিও এই রোগীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
PCOS কেন হয়?
পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম মূলত জিনগত ত্রুটি ও পরিবেশগত ত্রুটির সমন্বিত ফল। যাদের জিনগত ত্রুটি আছে, তাদের দৈহিক ওজন বৃদ্ধি পাওয়া, খুব কম শারীরিক শ্রম সম্পাদন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ করা (যেমন: অতিরিক্ত শর্করাযুক্ত খাবার) এই রোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। PCOS দেখা দেয় যখন ডিম্বাশয় অতিরিক্ত পরিমাণে টেস্টোস্টেরন হরমোন তৈরি করতে উদ্দীপ্ত হয়, যার পেছনে পিটুইটারি গ্রন্থি কর্তৃক অতিরিক্ত এলএইচ (LH) নিঃসরণ এবং দেহে ইনসুলিন রেজিস্টেন্সের উপস্থিতি বিশেষভাবে দায়ী।
PCOS নাম হওয়ার প্রধান কারণ হলো, এই রোগীদের ডিম্বাশয়ে বিভিন্ন বয়সি, বিভিন্ন আকারের, বিভিন্ন সংখ্যার সিস্ট (তরলপূর্ণ থলি) থাকতে পারে। তবে এটি পরিষ্কারভাবে একটি হরমোনজনিত সমস্যা। অধিকাংশ রোগীর দেহেই ইনসুলিন রেজিস্টেন্স থাকে এবং তারা স্থূলকায়া হয়।
রোগ শনাক্তকরণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা:
PCOS শনাক্ত করতে সচরাচর নিম্নলিখিত ক্রাইটেরিয়ার যেকোনো দুটির উপস্থিতি আবশ্যক:
নারীদেহে অতিরিক্ত এন্ড্রোজেন হরমোনের উপস্থিতির প্রমাণ।
অনিয়মিত ঋতুস্রাব।
ডিম্বাশয়ে সিস্ট।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে রয়েছে: সিরাম টেস্টোস্টেরন, এলএইচ (LH), এফএসএইচ (FSH) এর মাত্রা পরীক্ষা, পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং ওজিটিটি (OGTT – Oral Glucose Tolerance Test)।
চিকিৎসা ও জীবনযাপন ব্যবস্থাপনা:
PCOS-এর চিকিৎসায় জীবন-যাত্রা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্য ব্যবস্থাপনা: চিকিৎসার শুরুতেই খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দিতে হবে। সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা রোগিনীর দৈহিক ওজন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে সাহায্য করবে এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ার উন্নতি ঘটাবে, যাতে করে ইনসুলিন রেজিস্টেন্স কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। PCOS-এর খাদ্য তালিকায় শর্করার আধিক্য কম থাকবে; শাকসবজি (আলু বাদে), রঙিন ফলমূল ও আমিষজাতীয় খাদ্য প্রাধান্য পাবে।
শারীরিক শ্রম: দৈহিক ওজন বডি মাস ইনডেক্স (BMI) বিবেচনায় রেখে নিয়মিত শারীরিক শ্রমের ব্যবস্থা করতে হবে।
ওষুধ: নারীদের জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত পিলগুলো (যাতে স্বল্প মাত্রায় ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন থাকে) খুব সহায়ক হতে পারে। মেটফরমিন (Metformin) নামক ওষুধ ইনসুলিন রেজিস্টেন্স কমাতে ব্যবহৃত হয়। অবাঞ্ছিত লোম দূর করার জন্য কিছু ক্রিম এবং প্রজনন সম্ভাবনা বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ রয়েছে।
PCOS-এ আক্রান্ত নারীদের অধিকাংশই এই সমস্যার শারীরিক লক্ষণগুলোকে খুব দ্রুত বুঝতে পারেন না। কেউ কেউ লক্ষণগুলো বুঝতে পারলেও সংকোচ বোধের কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করেন। যেহেতু রোগটির ব্যাপকতা এবং সুদূরপ্রসারী স্বাস্থ্য ঝুঁকি আছে, তাই প্রজননক্ষম বয়সের সব নারীরই এই সমস্যা আছে কিনা তা জানার জন্য একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা বহু জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে।