মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ডাক্তারকে কী বলে কেঁদেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার? আজও চোখে জল আনবে সেই শেষ কথা!

সালটা ১৯৮০। ২৩ জুলাইয়ের বৃষ্টিভেজা এক অঝোর শ্রাবণ ধারায় ভিজেছিল তিলোত্তমা কলকাতা। কিন্তু শহরের অলিতে-গলিতে তখনও কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, প্রকৃতির সেই বিষণ্ণতার আড়ালেই বাংলা সিনেমার আকাশে নিভে যেতে বসেছে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও ধ্রুবতারাটি। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির শুটিং সেটে কাজ চলাকালীনই আচমকা মারাত্মক হৃদরোগে আক্রান্ত হন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার। অদ্ভুত এক শৈল্পিক মানসিক জোর আর আপসহীন পেশাদারিত্বে ভর করে সেই চরম অসুস্থতার অবস্থাতেই তিনি নিজের শট শেষ করেন, সহকর্মীদের একবিন্দু বুঝতে দেননি নিজের শরীরের ভেতর চলতে থাকা অসহ্য যন্ত্রণা। শুটিং ফ্লোর থেকে যখন তাঁকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে কলকাতার বেলভিউ নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন গাড়িতে শুয়েই ক্রমাগত অস্পষ্ট স্বরে কিছু একটা বিড়বিড় করে চলেছিলেন তিনি। কিন্তু ঝড়ের গতিতে ঘটে চলা সেই চরম মুহূর্তে কেউ বুঝতে পারেননি ঠিক কী বলতে চাইছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার মুকুটহীন সম্রাট।

হাসপাতালে ভর্তি করার পর বিশিষ্ট চিকিৎসক ড. সুনীল সেনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তড়িঘড়ি শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু মৃত্যুর সাথে সেই লড়াইটা যে ছিল অত্যন্ত কঠিন। বেলভিউয়ের হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ড. সেনের হাত শক্ত করে ধরে আকুল কণ্ঠে কেবল একটি কথাই বার বার বলে চলেছিলেন উত্তম— “আমাকে বাঁচান ডাক্তার, অনেক কাজ বাকি!” কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। বেঁচে থাকার সেই তীব্র আকুতি ও হাজারো না-বলা স্বপ্ন বুকে নিয়েই চিরতরে ওপারে চলে যান উত্তম।

এর বহু বছর পর এক জনপ্রিয় বিনোদন পত্রিকায় দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ড. সুনীল সেন অতীত স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, মহানায়ক তার ঠিক কিছুদিন আগে থেকেই তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ খেলেও নিজের ব্যস্ত ও অনিয়মিত জীবনযাত্রায় কিছুটা বদল আনার পরামর্শ তাঁকে প্রায়ই দেওয়া হতো। কিন্তু প্রতিবারই মিষ্টি হেসে উত্তম কুমার বলতেন, “আমাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখুন, বাকিটা আমি সামলে নেব।” ২৩ জুলাইয়ের সেই কালরাত আজও ভোলেননি অনেকে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রয়েছেন উত্তম। চারপাশে চিকিৎসকদের চরম ব্যস্ততার ভিড়। ক্রমাগত নজর রাখা হচ্ছে তাঁর অক্সিজেন লেভেল এবং হৃদস্পন্দনের ওপর। হাসপাতালের বাইরে তখন অগ্নিত ভক্তদের কান্নার রোল। আর কেবিনের দরজার সামনে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ভাই তরুণ কুমার। উত্তমের চোখ তখন আধা বোজা, যেন শেষবারের মতো চারিদিক দেখে নিতে চাইছেন। ডাক্তার সেন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তখনো উত্তমের মুখে সেই চেনা মিষ্টি হাসি পুরোপুরি ম্লান হয়নি। বরং অদ্ভুত এক দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল তাঁর মুখশ্রী। আর বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছিলেন, বাঁচতে চাই ডাক্তার! জীবন-মৃত্যুর দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীরের মাঝে দাঁড়িয়ে ড. সেনের কাছে এই একই বাঁচার আকুতি বারবার ফিরিয়ে এনেছিলেন তিনি।

কিন্তু নিয়তির নির্মম লিখন যে সেদিন সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। চিকিৎসকদের আপ্রাণ লড়াই এবং কোটি কোটি অনুরাগী বাঙালির অন্তরের প্রার্থনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে টানা তিনবার ভয়াবহ হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। অবশেষে ঘড়ির কাঁটা পার হতেই পরদিন, অর্থাৎ ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই চিরকালের মতো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মহানায়ক। সেই মর্মান্তিক খবরে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা বাংলা, কেঁপে ওঠে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগত।

আজ মহানায়কের প্রস্থানের সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। তবুও টলিউডের অন্দরে কিংবা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগণিত বাঙালির হৃদয়ে তাঁর সিংহাসন একচুলও টলানো যায়নি। আজও যখন প্রেক্ষাগৃহে নতুন করে মুক্তি পায় কালজয়ী ছবি ‘নায়ক’, তখনো হল থাকে হাউসফুল। সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তহীন পাতার নতুন প্রজন্মের হাত ধরে ভেসে ওঠে তাঁর চিরাচরিত ক্যারিশম্যাটিক রূপ ও মোহময়ী চাহনি। সময় বদলেছে, বদলেছে বিনোদনের মাধ্যম ও রুচি, কিন্তু আপামর বাঙালির হৃদয়ে ‘মহানায়ক’ কেবল একজনই—তিনি হলেন উত্তম কুমার।