অনুপম খেরের হুমকির মুখে পড়েছিলেন রীতা কয়রাল! ‘বাড়িওয়ালি’ ছবির নেপথ্যে কোন অন্ধকার ষড়যন্ত্র লুকিয়েছিল?

রুপোলি পর্দার ফ্ল্যাশলাইটের চাকচিক্যের আড়ালে যে কত গভীর অন্ধকার, ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার আস্ফালন লুকিয়ে থাকতে পারে, তা নিজের জীবন দিয়ে অনুভব করেছিলেন প্রয়াত অভিনেত্রী রীতা কয়রাল। ‘জননী’, ‘মৌচাক’, ‘অসুখ’ বা ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’-র মতো জনপ্রিয় কাজ উপহার দেওয়া এই প্রতিভাবান অভিনেত্রী শুধু পর্দায় অভিনয় করেননি, মুম্বই থেকে আসা প্রথম সারির অনেক তারকার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ডাবিং শিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু এই দক্ষতার কারণেই কি তিনি একসময় ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছিলেন? অনুপম খের ও ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল তাঁর নাম, যা আজ টলিউডের ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায়।

ঘটনার সূত্রপাত ২০০০ সালে। ঋতুপর্ণ ঘোষের কালজয়ী ছবি ‘বাড়িওয়ালি’। ছবিতে মুখ্য চরিত্রে ছিলেন কিরণ খের। ছবি মুক্তির পর প্রচার করা হয় যে, কিরণ খের নাকি রক্ত-জল করা পরিশ্রমে বাংলা শিখে নিজেই নিজের ডাবিং করেছেন! কিন্তু ছবি প্রেক্ষাগৃহে আসতেই বাঙালি দর্শকের কানকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়নি। পর্দার ‘বনলতা’-র মুখে যে কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল, তা যে কিরণের নয়, তা সমালোচকদের কাছে ছিল দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। অনেকে তখনই বুঝেছিলেন, এটি রীতা কয়রালের কণ্ঠ। কিন্তু রীতা তখন মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন, কারণ খোদ পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁকে সত্য গোপন রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি ঋতুপর্ণ প্রকাশ্যে অস্বীকারও করেছিলেন যে ছবির ডাবিং রীতা করেননি।

সত্যের বিনাশ নেই। জাতীয় পুরস্কারের দোরগোড়ায় যখন ছবিটি পৌঁছায়, তখন নিয়ম অনুযায়ী ডাবিং শিল্পীর নাম প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। জুরি বোর্ডের সদস্য পরিচালক গৌতম ঘোষ সরাসরি রীতাকে ফোন করেন। জাতীয় পুরস্কারের সম্ভাবনার কথা শুনে রীতা আর সত্য গোপন করতে পারেননি। তিনি স্বীকার করেন, ছবির সম্পূর্ণ ডাবিং তিনি করেছিলেন।

এই স্বীকারোক্তিই কাল হয়ে দাঁড়ায় রীতার জীবনে। ‘বাড়িওয়ালি’ ছবির প্রযোজক ছিলেন অনুপম খের। স্ত্রীর একক কৃতিত্ব ও পুরস্কার নিশ্চিত করতে তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। রীতাকে ফোন করে বিশাল অঙ্কের টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখান তিনি। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের এক শো-তে রীতা জানিয়েছিলেন, অনুপম তাঁকে বলেছিলেন, “প্রকাশ্যে ডাবিংয়ের ব্যাপারটি অস্বীকার করুন। যদি মুখ খোলেন, তবে মুম্বই তো বটেই, এমনকি বাংলাতেও কোনোদিন কাজ পেতে দেব না!”

টাকা বা হুমকির কাছে মাথা নত করেননি রীতা। সেই বছর জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান কিরণ খের পেলেও, পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেই কঠিন বাস্তব। পরবর্তীকালে ঋতুপর্ণ ঘোষ এই অন্যায়ের জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু রীতা কয়রালের অন্তরের ক্ষত শুকোয়নি। প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হওয়ার যন্ত্রণা বুকে নিয়েই ২০১৭ সালে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। টলিপাড়ার অন্দরে আজও ‘বাড়িওয়ালি’-র নাম উঠলেই, কিরণের কণ্ঠে যেন ফিরে আসে রীতার দীর্ঘশ্বাস আর সেই অন্যায্য বঞ্চনার ইতিহাস।