‘রাজপথে নেমে এসো!’-পাকিস্তানে লক্ষ সমর্থকের লং মার্চ, জানুন কেন?

পাকিস্তানের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই কারাগারে বন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে মেগা লং মার্চ শুরু করেছেন তাঁর লাখ লাখ সমর্থক। সোমবার দেশটির প্রাক্তন এই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) আনুষ্ঠানিকভাবে এই লং মার্চের তথ্য নিশ্চিত করেছে।

খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে শুরু লং মার্চ

গত রোববার দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে এই ইসলামাবাদ অভিমুখী লং মার্চের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এই প্রদেশে ক্ষমতায় রয়েছে পিটিআই সরকার। সুদীর্ঘ এই লং মার্চ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা প্রদক্ষিণ করে এবং একাধিক স্থানে যাত্রাবিরতি শেষে অবশেষে ইসলামাবাদে এসে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।

এই লং মার্চের নেতৃত্বে থাকা খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি সমর্থকদের উদ্দেশ্যে জোরালো আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘‘আমি আপনাদের সবাইকে রাজপথে নেমে আসার আকুল আহ্বান জানাচ্ছি। তরুণসমাজ, তোমরা তোমাদের কারারুদ্ধ প্রিয় নেতার স্বার্থে রাজপথে নেমে এসো।’’

রাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত যেখান থেকে

২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে পিটিআই নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ইমরান খান ও বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মধ্যে এই তীব্র বিভেদের সূত্রপাত হয়। শুরু থেকেই ইমরান খান অভিযোগ করে আসছেন যে, তাঁর পতনের নেপথ্যে দেশের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর হাত ছিল। যদিও সেনাবাহিনী এই অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করে এসেছে।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের মে মাসে ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হলে রাজনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করে। তাঁর সমর্থকরা সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালালে দেশজুড়ে ব্যাপক দমনপীড়ন শুরু হয়, যেখানে হাজার হাজার পিটিআই নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭৪ বছর বয়সী প্রাক্তন এই ক্রিকেট তারকা বর্তমানে নিজেকে একজন ‘রাজনৈতিক বন্দি’ হিসেবে দাবি করছেন।

আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় উত্তেজনা তুঙ্গে

এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর এই লং মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, পিটিআইয়ের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ায় তা স্থগিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহের শেষের দিকে সরকারের সঙ্গে পিটিআইয়ের সেই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চূড়ান্তভাবে ভেস্তে যায়। এর পরেই রাজপথে নেমে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেয় দলটির নেতৃত্ব।

ইসলামাবাদে কড়া নিরাপত্তা ও কনটেইনারের ব্যারিকেড

সম্ভাব্য সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে বর্তমানে রাজধানী ইসলামাবাদ ও তার আশপাশের অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাস সংবলিত অতিগুরুত্বপূর্ণ সরকারি চত্বর সুরক্ষিত রাখতে বড় বড় শিপিং কনটেইনার দিয়ে পুরো এলাকা অবরুদ্ধ ও ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বিক্ষোভকারীদের কোনোভাবেই ইসলামাবাদে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমরা এই সমস্যার নিস্পত্তি একেবারে চিরতরে করব। কোনো রাজনৈতিক দলকে নিজেদের ইচ্ছامতো দেশের রাজধানীতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্তব্ধ করার সুযোগ দেওয়া যায় না।” সবমিলিয়ে ইমরান খানের মুক্তি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বর্তমানে এক ঐতিহাসিক ও থমথমে পরিস্থিতির মুখোমুখি পাকিস্তান।