‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা! কেন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিল হাত শিবির?

সরকারি এবং বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে এবার থেকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘বন্দে মাতরম’ গানটি সম্পূর্ণ গাওয়ার নিয়মে বড়সড় পরিবর্তন আনল কর্নাটক সরকার। স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখন থেকে যে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে এই উপাসনা সঙ্গীতের শুধুমাত্র প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হবে। সম্প্রতি কর্নাটকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমার এই কথা ঘোষণা করে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এ বিষয়ে তাঁর সরকার কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তই পুরোপুরি মেনে চলবে এবং দলের লাইনই হবে সরকারের অবস্থান।
চলতি বছর স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে কর্নাটকে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ অর্থাৎ ছটি স্তবকই গাওয়া হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ উঠতেই ডিকে শিবকুমার সাফ জানান, বিষয়টি হয়তো তাঁর অজান্তেই ঘটেছে অথবা রাজভবনের তরফে তেমনটা হয়েছে। তবে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, ভবিষ্যতে রাজ্যের কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে আর পুরো গানটি গাওয়া হবে না, বরং নিয়ম মেনে কেবল প্রথম দুটি স্তবকই পরিবেশন করা হবে।
ইন্ডিয়া টুডে রাউন্ডটেবিলে ডিকে শিবকুমারের সাফাই:
সম্প্রতি একটি নামী সংবাদমাধ্যমের আয়োজিত রাউন্ডটেবিল বৈঠকে এই সংক্রান্ত প্রশ্ন করা হলে কর্নাটকের উপমুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি আমার দলের আদর্শ এবং শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী। দল যে যৌথ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাই আমাদের সরকার ও দলের চূড়ান্ত অবস্থান। আমার অজান্তে বা অন্য কোথাও অতীতে যা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে বলছি যে আগামী দিনে সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানে আমরা দলীয় নির্দেশিকা মেনেই কেবল দুটি স্তবকই গাইব।”
পাশাপাশি, এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিজেপি শিবিরকে তীব্র আক্রমণ করতেও ছাড়েননি তিনি। ডিকে শিবকুমার অভিযোগ করেন, ভারত একটি বহুত্ববাদী ও সর্বধর্ম সমন্বয়ের দেশ, আর বিজেপি সবসময় সংকীর্ণ তোষণের রাজনীতি করে আসছে। কিন্তু কংগ্রেস সব ধর্ম ও সমাজের প্রতিটি অংশকে একসঙ্গে নিয়ে চলার নীতিতে বিশ্বাস করে।
কংগ্রেসের নতুন সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক জলঘোলা:
উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি (CWC) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৩৭ সালের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে কংগ্রেসের তরফে জানানো হয়, যে কোনো জনসমাবেশ বা জাতীয় অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’-এর সমস্ত স্তবক গাওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং শুধুমাত্র প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া উচিত। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন ‘বন্দে মাতরম বিল’-এ জাতীয় সঙ্গীতের মতো এই গানটিরও সমস্ত স্তবক বাধ্যতামূলকভাবে গাওয়ার প্রস্তাব আসার পরই কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক তরজা চরম আকার ধারণ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের এই নির্দেশিকা না মানার নেপথ্যে রয়েছে ধর্মীয় ভাবাবেগ ও বিতর্ক এড়ানোর কৌশল। কংগ্রেসের অন্দরের যুক্তি অনুযায়ী, ‘বন্দে মাতরম’-এর পরবর্তী স্তবকগুলিতে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর মতো হিন্দু দেব-দেবীদের প্রত্যক্ষ উল্লেখ রয়েছে। ফলে দেশের সংখ্যালঘু বা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই অংশগুলি আপত্তিকর মনে হতে পারে কিংবা বিভাজনের বার্তা দিতে পারে। আর এই কারণকেই হাতিয়ার করে গেরুয়া শিবির ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েছে। বিজেপির অভিযোগ, হাত শিবির তুষ্টিকরণের রাজনীতি করতে গিয়ে এবং নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্কের কথা মাথায় রেখে সরাসরি জাতীয় ভাবাবেগ ও ঐতিহ্যের অবমাননা করছে। সব মিলিয়ে, এই নতুন নির্দেশিকা ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাপ যে আগামী দিনে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।