রংপুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, পুলিশের বয়ানের সঙ্গে মিলছে না ফরেনসিক রিপোর্ট, তীব্র চাপে প্রশাসন

বাংলাদেশের রংপুরে এক অবসরপ্রাপ্ত হিন্দু শিক্ষক ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এবার চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। গত ২২ আগস্ট মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে অগ্নি এবং ছেলে প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল গোটা এলাকায়। তবে সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা ফরেনসিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের প্রাথমিক বিবৃতির মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য ধরা পড়ায় শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ফরেনসিক তদন্তের এই নতুন তথ্যগুলো তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কী জানা যাচ্ছে?
ফরেনসিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নিহত চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। মৃতদেহগুলো উদ্ধারের সময় তাতে মারাত্মক পচন ধরেছিল এবং পোকা ধরে গিয়েছিল। তবে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে যৌন নির্যাতনের কোনো প্রমাণ মেলেনি এবং মৃতদেহগুলোতে রাসায়নিক ব্যবহারেরও কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে হত্যাকাণ্ডের সময়কাল নিয়ে। পুলিশ দাবি করেছিল যে ঘটনাটি ঘটেছিল শুক্রবার এবং মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয় শনিবার। কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্টে ইঙ্গিত মিলেছে যে মৃত্যুর ঘটনাটি দেহ উদ্ধারের অন্তত দুই থেকে চার দিন আগেই ঘটেছিল। পচনের মাত্রা দেখে মৃত্যুর সঠিক সময় নির্ধারণ করতে গিয়েই পুলিশের দেওয়া টাইমলাইনের সঙ্গে ফরেনসিক রিপোর্টের এই বড় ফারাক সামনে চলে এসেছে।
ইয়াবা সেবনের দাবি নিয়ে বিতর্ক
তদন্তকারীদের একটি সূত্র দাবি করেছিল যে সন্দেহভাজনরা হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী, অপরাধীরা খুনের পর ওই বাড়িতেই স্নান করে, ফ্রিজ থেকে খেজুর বের করে খায় এবং মাদক সেবন করার পর এলাকা ছাড়ে।
তবে ফরেনসিক ও অন্য একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এই দাবিকে পুরোপুরি মনগড়া বলে উড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, এতগুলো ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করার পর আসামিদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে বাড়িতে অবস্থান করা, খাওয়া-দাওয়া করা এবং অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করা চিকিৎসাগত ও বাস্তবসম্মতভাবে কতটা সম্ভব। তাছাড়া ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ধস্তাধস্তি বা হাতাহাতির স্পষ্ট চিহ্নও পাওয়া গেছে, যা পুলিশের গল্পকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তীব্র চাপের মুখে সরকার ও প্রশাসন
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। রংপুর পুলিশ ইতোমধ্যে মুগ্ধো দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামের দুইজনকে গ্রেপ্তার করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও অনেকে জড়িত রয়েছে এবং আসল ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে আন্দোলন শুরু হওয়ায় মামলার তদন্তভার শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে।
পাশাপাশি, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ধর্ষণের প্রমাণ মেলেনি বলা হলেও স্থানীয়রা এবং বিভিন্ন সংগঠন এই নিয়ে তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের একটি স্টিং অপারেশনে মর্গের এক কর্মচারী নিহত নারীদের শরীরে বীর্য পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে, যা ক্ষোভের আগুন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং তথ্য গোপনের চেষ্টার অভিযোগে গত কয়েক দিন ধরেই ফুঁসছে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়। আগামী বৃহস্পতিবার এই ঘটনার প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভ দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের। বর্তমান সরকারের ছয় মাস পূর্তির সময়ই এই ধরনের নিরাপত্তা সংকট এবং সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ এখন চরমে পৌঁছেছে।