রোগী ভর্তির পরেই ৭২ ঘণ্টা প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ! সরকারি চিকিৎসকদের জন্য বড় নিয়ম স্বাস্থ্য দফতরের

পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা এবং চিকিৎসকদের কর্মসংস্কৃতিতে বড়সড় বদল আনতে এক কড়া নির্দেশিকা জারি করল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকেরা রোগী ভর্তির দিন এবং তার ঠিক পরবর্তী দুই দিন—অর্থাৎ মোট ৭২ ঘণ্টার জন্য কোনও ধরনের প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। স্বাস্থ্য ভবনের তরফে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, ‘পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস রুলস, ২০০৬’-এর নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখেই সরকারের হাতে এই ক্ষমতা রয়েছে। রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও সুনিশ্চিত করতে এবং হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি সুদৃঢ় করতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ভবনের এই নয়া নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসার পরেই চিকিৎসক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে এবং বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদল চিকিৎসক ও সংগঠন এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানালেও, অন্য একটি অংশ এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। হেলথ সার্ভিস ডক্টরসের সম্পাদক ডা. উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর মতে, এই ধরনের বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের উচিত ছিল সমস্ত চিকিৎসক সংগঠনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, যেসব বিভাগের নিয়মিত অ্যাডমিশন ডে বা রোগী ভর্তির দিন থাকে না, সেইসব বিভাগের চিকিৎসকেরা কি প্রতিদিন নিয়ম মতো প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন? তাঁর দাবি, এই নির্দেশের পেছনে পর্যাপ্ত পরিকল্পনা এবং সুনির্দিষ্ট চিন্তাভাবনার অভাব রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ন্যাশনাল মেডিক্যাল অর্গানাইজেশন (NMO)। সংগঠনের দক্ষিণবঙ্গের সম্পাদক ডা. অর্ণপ পাল জোরালো সওয়াল করে জানিয়েছেন যে, স্বাস্থ্য দফতরের এই নির্দেশের ফলে সরকারি হাসপাতালে রোগী পরিষেবা আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত হবে। তাঁর মতে, সিনিয়র ফ্যাকাল্টিরা যদি হাসপাতালে সময় দেন, তবে পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আসবে এবং এর ফলে নবীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি চিকিৎসকেরাও আরও দক্ষ ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠবেন। তবে তিনিও একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান চিকিৎসা শিক্ষায় শিক্ষক সংকট মেটাতে রাজ্য সরকারকে স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটতে হবে এবং ব্যাপক হারে নতুন চিকিৎসক নিয়োগ করতে হবে।
পুরো বিষয়টি নিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ মতামত তুলে ধরেছেন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (IMA)-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার সম্পাদক ডা. শান্তনু সেন। তিনি একটি বাস্তবসম্মত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জানান যে, অতীতে এমন বহু অভিযোগ পাওয়া গেছে যেখানে কিছু চিকিৎসক রোগী ভর্তির ঠিক পরেই নিজেদের ডিউটি বা দায়িত্ব জুনিয়র ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কাঁধে চাপিয়ে বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা অপারেশনে চলে যান। তবে একই সঙ্গে তিনি এও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বহু চিকিৎসক অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন এবং নিয়মনীতি মেনে চলেন। তাই তিনি দাবি তুলেছেন, নিয়ম ভঙ্গের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হোক, তবে যে সমস্ত চিকিৎসক সততার সঙ্গে কাজ করছেন, তাঁদের ওপর যেন কোনও ধরনের অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা অবিচার না করা হয়।