নাম শুনলে মনে হয় কালো, অথচ মুখে দিলেই মিল যায় সাদা কালাকাঁদ! জানেন কি এই জনপ্রিয় মিষ্টির আসল রহস্য?

মিষ্টির দোকানের কাচের বাক্সে থরে থরে সাজানো সাদা, নরম ও দানাদার কালাকাঁদের দিকে তাকালে জিভে জল আসে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে যে কোনো উৎসব-অনুষ্ঠানে এই মিষ্টির কদর চিরকালই আলাদা। মুখে দিলেই মাখনের মতো মিলিয়ে যাওয়া এই মিষ্টির জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, মিষ্টিটি পুরোপুরি দুধের মতো সাদা হওয়া সত্ত্বেও এর নাম কেন ‘কালাকাঁদ’? নাম শুনলে যেখানে মনের কোণে গাঢ় কালো বা কালচে কোনো রঙের ছবি ভেসে ওঠে, সেখানে এর আসল রূপ সম্পূর্ণ বিপরীত। এই নামের অদ্ভুত বিভ্রাট ও নেপথ্যের ইতিহাস সম্পর্কে দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষই সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।
জনপ্রিয় এই মিষ্টির উৎপত্তির ইতিহাস ঘাঁটলে অবাক হতে হয়। আমরা বাঙালিরা একে নিজেদের মতো করে আপন করে নিলেও, কালাকাঁদের জন্ম বাংলায় নয়, বরং রাজস্থানের ঐতিহাসিক আলোয়ার শহরে। ১৯৪৭ সালে আলোয়ারের প্রখ্যাত হালুইকর বাবা থিরুমল সাহা প্রথম এই সুস্বাদু মিষ্টির রেসিপি তৈরি করেছিলেন। ছানা, ক্ষীর এবং চিনি একসঙ্গে দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে বরফির আকারে তৈরি করা এই নতুন ঘরানার মিষ্টি মুহূর্তের মধ্যে আলোয়ারে সুপারহিট হয়ে যায়। এমনকি আজও আলোয়ার শহরকে ‘কালাকান্দের শহর’ বলা হয় এবং সেখানে ‘কালাকান্দ বাজার’ নামে একটি আস্ত বিখ্যাত বাজারও রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, সাদা রঙের এই মিষ্টির নাম কেন ‘কালাকাঁদ’ হলো? এই বিষয়ে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে দুটি প্রধান মত প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় মতটি হলো ‘কলা’ এবং ‘কান্দ’ শব্দ দুটির সংমিশ্রণ। হিন্দি ও সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘কলা’ শব্দের অর্থ হলো কোনো বিশেষ শিল্প, কারিগরি বা মানুষের নিখুঁত দক্ষতা। অন্যদিকে ‘কান্দ’ বলতে মিষ্টি বা চিনিজাতীয় খাদ্যকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থে ‘কালাকান্দ’ কথার অর্থ দাঁড়ায় ‘শিল্প বা কারিগরি দক্ষতার মাধ্যমে তৈরি মিষ্টি’। সঠিক তাপমাত্রায় দুধের ছানা ও ক্ষীরকে দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে নিখুঁত দানাদার রূপ দেওয়া যে এক বিরাট শিল্প, তা সাধারণের আয়ত্তের বাইরে। সেই শিল্পকর্মের স্বীকৃতি থেকেই এর নাম হয়েছিল কালাকান্দ, যা পরবর্তীকালে বাংলায় এসে উচ্চারিত হতে শুরু করে কালাকাঁদ হিসেবে।
এছাড়াও গ্রামের দিকে আরেকটি স্থানীয় গল্প প্রচলিত রয়েছে। অতীতে এই মিষ্টি তৈরির কাজ হতো বড় বড় লোহার কালো কড়াইতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রচণ্ড আঁচে জ্বাল দিতে দিতে কড়াইয়ের তলা অংশ কালো হয়ে যেত এবং তার প্রভাবে মিষ্টিতেও এক ধরণের হালকা বাদামি বা কালচে আভা চলে আসত। সেই কালো কড়াই থেকেই নাকি কালক্রমে এই মিষ্টির নাম কালাকাঁদ হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। তবে ইতিহাসবিদ ও খাদ্য বিশারদরা এই লোককথার চেয়ে প্রথম মতটিকে অর্থাৎ কারিগরের হাতের জাদুকরী শিল্পকেই বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন। সুতরাং, নামের সঙ্গে কালো রঙের কোনো দূরতম সম্পর্ক নেই, এর আসল যোগ রয়েছে শিল্পীর নিপুণ হাতের জাদুতে। তাই পরবর্তীতে যখনই পেস্তা ছড়ানো নরম কালাকাঁদের স্বাদ নেবেন, তখন মনে রাখবেন আপনি কেবল একটি মিষ্টি খাচ্ছেন না, বরং উপভোগ করছেন এক টুকরো জীবন্ত শিল্পকলা।