পুরোনো বইয়ের গন্ধ কেন ভ্যানিলার মতো লাগে? জানুন নেপথ্যের মিষ্টি বৈজ্ঞানিক রহস্য!

পুরোনো বইয়ের পাতা উল্টালে যে হালকা ও মিষ্টি গন্ধ নাকে আসে, তা কেবল নস্ট্যালজিয়া বা স্মৃতির রোমন্থন নয়। অনেকের কাছেই এই গন্ধ শৈশবের লাইব্রেরি, পুরনো বইয়ের দোকান বা অতীতের কোনো অমলিন স্মৃতির দুয়ার খুলে দেয়। তবে বিজ্ঞান বলছে, এই সুবাস মূলত বইয়ের ধীরে ধীরে পুরনো হয়ে ওঠার একটি প্রাকৃতিক লক্ষণ। বই তৈরি হয় কাঠ থেকে এবং এতে সেলুলোজ ও লিগনিনের মতো নানা প্রাকৃতিক উপাদান থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাগজের ভেতরে ‘অ্যাসিড হাইড্রোলাইসিস’ (acid hydrolysis) নামক একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে কাগজটি ভাঙতে বা ক্ষয়ে যেতে শুরু করে এবং বাতাসে বিভিন্ন উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা ভিওসি (VOCs) ছড়িয়ে পড়ে।

এই যৌগগুলির মধ্যে ‘ভ্যানিলিন’ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এটি ঠিক সেই উপাদান যা প্রাকৃতিক ভ্যানিলাকে তার সুপরিচিত সুবাস প্রদান করে থাকে। আর এই কারণেই পুরোনো বই থেকে এমন ভ্যানিলার মতো মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া বেনজালডিহাইড বাদামের মতো সুবাস তৈরি করে এবং অন্যান্য যৌগ ফুল বা মিষ্টতার অনুভূতি জাগায়। সব পুরোনো বইয়ের গন্ধ কিন্তু একরকম হয় না। বইয়ের গন্ধ পুরোপুরি নির্ভর করে কাগজ তৈরির পদ্ধতি, ব্যবহৃত কালি ও আঠা এবং বছরের পর বছর ধরে বইটি কী ধরনের পরিবেশে সংরক্ষিত ছিল তার ওপর। কোনো বই স্যাঁতসেঁতে জায়গায় থাকলে তাতে ভ্যাপসা বা ছত্রাকের গন্ধ হতে পারে, আবার সূর্যালোক বা ধুলোবালিও গন্ধে পরিবর্তন আনে।

মজার বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা বইয়ের গন্ধ শুঁকেও সেগুলির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করতে পারেন। ২০০৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় “ম্যাটেরিয়াল ডিগ্রাডোমিক্স” (material degradomics) নামক একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়। এই প্রযুক্তির সাহায্যে বইয়ের পাতা না কেটে বা কোনো ক্ষতি না করেই গন্ধের রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে গবেষকরা বুঝতে পারেন বইটি কত দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। ঐতিহাসিক বইয়ের গন্ধ নিয়ে ধারণা পেতে গবেষকরা ‘হিস্টোরিক পেপার ওডর হুইল’ (Historic Paper Odor Wheel) বা ঐতিহাসিক কাগজের গন্ধের একটি নির্দেশক-চক্রও তৈরি করেছেন। মানুষ প্রায়ই পুরোনো বইয়ের সুবাসকে চকলেট, কফি বা ভ্যানিলার সঙ্গে তুলনা করে। অন্যদিকে, বর্তমানে উৎপাদিত উন্নত মানের কাগজ থেকে অধিকাংশ লিগনিন সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে পাতা দীর্ঘ সময় সাদা থাকে। এই কারণেই আধুনিক বইয়ে দশকের পর দশক পার হলেও এমন ভ্যানিলার গন্ধ পাওয়া যায় না।