সোনা বন্ধক রেখেই কোটিপতি হওয়ার খেলা! আদিত্য বিড়লা থেকে টাটা-গোদরেজ—হঠাৎ কেন সোনায় বিনিয়োগের হিড়িক?

ভারতের আর্থিক বাজারে সিকিউরড লোন বা সুরক্ষিত ঋণের চাহিদা যেভাবে আকাশ ছুঁতে শুরু করেছে, তাতে একের পর এক কর্পোরেট জায়েন্ট এই লাভজনক সেক্টরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। খুচরো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ বা এমএসএমই (MSME) ঋণ ব্যবসাকে আরও শক্তিশালী ও বহুগুণ প্রসারিত করার এক সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে এবার গোল্ড লোন বা স্বর্ণ ঋণ ব্যবসায় আনুষ্ঠানিকভাবে পা রাখল নামী শিল্পগোষ্ঠী আদিত্য বিড়লা ক্যাপিটাল লিমিটেড। সংস্থার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আগামী তিন বছরের মধ্যে সারা দেশজুড়ে প্রায় ১,০০০টি ডেডিকেটেড গোল্ড লোন শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর প্রথম ধাপে আগামী ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যেই দেশের প্রায় ৩০০টি কৌশলগত এলাকায় এই শাখাগুলি চালু করে ফেলা হবে, যেখানে সোনার বিপরীতে ঋণের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বলে অনুমান করা হচ্ছে।

কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রকাশিত নিয়ন্ত্রক ফাইলিংয়ে জানানো হয়েছে যে, গ্রাহকরা তাঁদের জমানো সোনা জামানত হিসেবে রেখে অত্যন্ত সহজ, স্বচ্ছ এবং দ্রুততার সঙ্গে এই ঋণ পরিষেবা গ্রহণ করতে পারবেন। এই ঘোষণা সামনে আসার পরেই শেয়ার বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিএসইতে (BSE) আদিত্য বিড়লার শেয়ারের দাম ৩.০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সরাসরি ৪০৮.২০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। কোম্পানির এনবিএফসি ব্যবসার সিইও এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রাকেশ সিংয়ের মতে, দেশের ক্রমবর্ধমান সোনার বাজারের চাহিদা মেটাতে এবং সুরক্ষিত ঋণ পোর্টফোলিও শক্তিশালী করতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সময়োপযোগী। শহুরে এবং আধা-শহুরে দুই প্রান্তের গ্রাহকদের কাছেই এই পরিষেবা পৌঁছে দিতে সংস্থার বিশাল বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং শক্তিশালী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে পুরোপুরি কাজে লাগানো হবে।

তবে একা আদিত্য বিড়লা নয়, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ভারতের গোল্ড লোন বাজারে কর্পোরেট সংস্থাগুলির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছে। এর আগে টাটা ক্যাপিটাল এবং গোদরেজ ক্যাপিটালের মতো হেভিওয়েট শিল্পগোষ্ঠীও এই খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। টাটা ক্যাপিটাল যেখানে ‘যোগাক্ষেমম লোনস’-এর প্রায় ৮৮.৬ শতাংশ অংশীদারিত্ব কেনার ঘোষণা করেছে, তেমনই গোদরেজ তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গোদরেজ ফাইন্যান্সের মাধ্যমে ‘কনকদুর্গা ফাইন্যান্স’-এর গোল্ড লোন ব্যবসা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। পাশাপাশি এলঅ্যান্ডটি ফাইন্যান্স, ইনক্রেড ফাইন্যান্স এবং বেইন ক্যাপিটালের মতো সংস্থাগুলির আগমন মুথুট ফাইন্যান্স বা মানাপ্পুরম ফাইন্যান্সের মতো ঐতিহ্যবাহী জায়েন্টদের একচেটিয়া বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ফেলেছে।

স্বর্ণ ঋণ ব্যবসার প্রতি হঠাৎ এই বিপুল কর্পোরেট আকর্ষণের মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে ভারতীয় বাজারে সোনার দামের লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ এবং এর নিখুঁত আর্থিক নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের শেষের দিকে দেশের সোনার গহনার বিপরীতে মোট ঋণের পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে ৩.২৯ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬৯.৯ শতাংশ বেশি। সাধারণ মানুষ এখন সোনা সরাসরি বিক্রি করে ফেলার চেয়ে সঙ্কটের দিনে তা সাময়িকভাবে বন্ধক রেখে তরল অর্থ সংগ্রহ করাকেই অনেক বেশি লাভজনক মনে করছেন। ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদার, স্ব-নিযুক্ত পেশাদার এবং বেতনভোগী মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিও মূলত চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা কিংবা আকস্মিক জরুরি আর্থিক চাহিদা মেটাতে এই গোল্ড লোনের ওপর ভরসা রাখছেন।