তীব্র খরার কবলে ফ্রান্স, জল সংকটে দিশেহারা হাজার হাজার মানুষ, ট্যাঙ্কারে চলছে জীবন

অগাস্টের শুরু থেকেই পূর্ব ফ্রান্সের সেন্ট মেরি অক্স মাইনস শহরে এক অদ্ভুত চিত্র দেখা যাচ্ছে। সপ্তাহে দুইবার সেখানে জলের ট্যাঙ্কার ঢুকছে। তারা কোনো জ্বালানি তেল বা দুধ সরবরাহ করতে আসছে না, তারা আসছে পাঁচ হাজার বাসিন্দার এই পাহাড়ি শহরের তৃষ্ণা মেটাতে। যে শহরটি একসময় পাহাড়ের ২০টি ঝরনার শীতল জলে সমৃদ্ধ ছিল, আজ তীব্র দাবদাহে সেই ঝরনাগুলি হয় শুকিয়ে গেছে, নয়তো জলস্তর বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে গেছে।

প্রকৃতির এমন চরম রূপ কেবল সেন্ট মেরি অক্স মাইনস শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। কয়েক কিলোমিটার দূরের শহর লিয়েভ্রতে আধুনিক জল সরবরাহ ব্যবস্থা থাকলেও, পাইপলাইনের অভাবের কারণে সেখান থেকে জল আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়েই প্রশাসনের উদ্যোগে ট্যাঙ্কারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে জনজীবন। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং গোটা ফ্রান্সের একটি ক্রমবর্ধমান সংকটের প্রতিচ্ছবি।

ফরাসি সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অগাস্ট মাসে ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ সরাসরি তীব্র জলকষ্টের শিকার। তবে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। প্রায় পাঁচ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ বর্তমানে তীব্র জলকষ্টের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফ্রান্সের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ভয়াবহ খরার কবলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন অঞ্চলে জল ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কিছু এলাকায় জলের স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে জল পৌঁছে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফ্রান্সের জলস্তর ক্রমশ কমছে। ২০২২ সালেও ফ্রান্স এমন ভয়াবহ খরার সাক্ষী ছিল। সেই সময়ও দেশের কয়েকশ পুরসভাকে জলের জন্য ট্যাঙ্কারের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। এবার পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

ইউরোপীয় পরিবেশ এজেন্সির (EEA) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা এবং এক তৃতীয়াংশ মানুষ এই জলকষ্টের সরাসরি প্রভাবে পড়ছেন। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, যদি জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আগামীতে পানীয় জলের এই হাহাকার আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পাহাড়ী ঝরনা আর নদীমাতৃক ফ্রান্সের জনজীবনে এই জল সংকট আজ এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় সরকার এই বিপর্যয় মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।