পুতিনের মিসাইল আঘাতেই কি ধূলিস্যাৎ লক্ষ্মী মিত্তলের সাম্রাজ্য? ইউক্রেনের বৃহত্তম স্টিল কারখানায় ভয়াবহ রক্তপাত!

রাশিয়া ও ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে এবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলো ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশ্বখ্যাত ধনকুবের লক্ষ্মী মিত্তলের শিল্পসাম্রাজ্য। ইউক্রেনের ক্রিভি রিহ (Kryvyi Rih) অঞ্চলে অবস্থিত ‘আর্সেলর-মিত্তল’ (ArcelorMittal) সংস্থার খনি ও ধাতুবিদ্যা কমপ্লেক্স—যা ইউক্রেনের সর্ববৃহৎ ইন্টিগ্রেটেড স্টিলের কারখানা হিসেবে পরিচিত—সম্প্রতি এক ভয়াবহ রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। ইউক্রেনের তীব্র ও লাগাতার ড্রোন হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে রাশিয়া এই মিসাইল হানা চালিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই রক্তক্ষয়ী হামলায় কারখানার ভেতরেই দু’জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন শ্রমিক। হামলার জেরে কারখানার মূল শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্লাস্ট ফার্নেস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাধ্য হয়েই উৎপাদন প্রক্রিয়া বা প্রডাকশনের একটি বড় অংশ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কারখানার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইউক্রেনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এই অতর্কিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কারখানার কর্মীরা সরাসরি আঘাত পেয়েছেন। এর ঠিক আগে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী রাশিয়ার ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে শত শত ড্রোন নিয়ে একযোগে সর্বাত্মক আক্রমণ চালায়। আকাশপথে চালানো ওই ভয়াবহ হামলায় রাশিয়ার ভেতরে অন্তত ছ’জন সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে খবর মিলেছে। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ এই ভয়াবহ আক্রমণকে “সাম্প্রতিক সময়ের স্মৃতিতে অন্যতম বৃহত্তম ড্রোন হামলা” বলে অভিহিত করেছেন। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, দেশের আকাশসীমা সুরক্ষায় তারা রাতভর গোটা রাশিয়া জুড়ে অন্তত ৮২২টি ইউক্রেনীয় ড্রোনকে সফলভাবে প্রতিহত করেছে।
ভোরোবিয়ভ আরও জানান যে, মস্কো অঞ্চলের একটি আবাসিক ভবনে ইউক্রেনের ড্রোন আঘাত হানার পর এক ৮৩ বছর বয়সি বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি, ইউক্রেনের অপর একটি হামলার জেরে পোদলস্ক শহরে রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন খুচরো বিক্রেতা সংস্থা ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’-এর (Wildberries) একটি বিশাল গুদামে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। উল্লেখ্য, এই ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’ সংস্থাটি রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী মহিলা ও ধনকুবের তাতিয়ানা কিমের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন যে, প্রায় ৬০০টি ড্রোনকে মস্কোর দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গিয়েছিল, যার মধ্যে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ড্রোনকে মস্কোর আকাশেই ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলেও ১৫০টিরও বেশি ড্রোন নিয়ে আরেকটি তীব্র আক্রমণ চালানো হয়, যেখানে পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় গভর্নর ইউরি স্লিউসার।
চলতি বছরে ইউক্রেন যেভাবে রাশিয়ার ভূখণ্ডে তাদের আক্রমণের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। দূরপাল্লার আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ঝাঁকে ঝাঁকে ঘাতক ড্রোনের মাধ্যমে রাশিয়ার সামরিক শিল্প কেন্দ্র, জ্বালানি পরিকাঠামো এবং লজিস্টিকস জায়ান্টদের ডিপোগুলিকে লাগাতার টার্গেট করা হচ্ছে। এর ফলে কোটি কোটি ডলারের সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মস্কোর ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পর এই ধরনের সর্বাত্মক হামলাগুলি এখন খোদ রাশিয়ার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দোরগোড়ায় যুদ্ধের ভয়াবহ আঁচ পৌঁছে দিচ্ছে। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় শিল্পপতির কারখানায় রুশ হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে নতুন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।