এয়ার ইন্ডিয়ায় বড়সড় বিপাক! ড্রাগ টেস্টে ফেল দুই পাইলট, চরম চাঞ্চল্য এভিয়েশন মহলে

ফুকেত থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে আকস্মিক মারাত্মক ঝাঁকুনি এবং একাধিক যাত্রী জখম হওয়ার রোমহর্ষক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের এক নতুন এবং গুরুতর বিপাকে পড়ে গেল দেশের অন্যতম প্রধান বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া। টাটা গোষ্ঠীর মালিকানাধীন এই নামী বিমান সংস্থার অন্দরমহল থেকে পাওয়া অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গিয়েছে যে, সংস্থার আরও দুই পাইলট সম্প্রতি তাঁদের প্রাথমিক ড্রাগ টেস্ট বা মাদক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এই আকস্মিক ও চাঞ্চল্যকর তথ্যের পরই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও যাত্রী সুরক্ষা নিয়ে তীব্র শোরগোল শুরু হয়ে গেছে।
যদিও ওই দুই পাইলটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত পরীক্ষার বিশদ রিপোর্টের জন্য এই মুহূর্তে অফিশিয়ালভাবে অপেক্ষা করা হচ্ছে, তবে বিমান সংস্থা কোনো রকম ঝুঁকি নিতে নারাজ। চূড়ান্ত রিপোর্ট আসার আগেই ওই দুই অভিযুক্ত পাইলটকে বিমানের ককপিট পরিচালনার দায়িত্ব তথা রোস্টার থেকে সম্পূর্ণভাবে সাময়িক অব্যাহতি বা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ফুকেত-দিল্লি ফ্লাইটের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষের এই ধরনের কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই ফুকেত থেকে রাজধানী দিল্লি অভিমুখে রওনা হওয়া এয়ার ইন্ডিয়ার একটি এয়ারবাস এ-৩২০ নিও (Airbus A-320Neo) বিমান মাঝ আকাশে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল। মাঝ আকাশে থাকাকালীন বিমানটি আকস্মিকভাবে প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে আসে। শুরুতে বিমান কর্তৃপক্ষ ও যাত্রীরা ঘটনাটিকে নিতান্তই একটি সাধারণ ‘টার্বুলেন্স’ বা বায়ুমণ্ডলীয় ঝাঁকুনি বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বিমানের অত্যাধুনিক সিস্টেম লগের ডিজিটাল ডেটা প্রকাশ্যে আসতেই আসল এবং ভয়াবহ সত্যটি সকলের সামনে উন্মোচিত হয়।
তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে যে, ওই নির্দিষ্ট বিমানটির তিনটি প্রধান হাইড্রোলিক সিস্টেমে একসঙ্গে এক নজিরবিহীন গোলযোগ বা ফেলিওর দেখা দিয়েছিল। এর ফলে একটানা দীর্ঘ চার সেকেন্ডের জন্য বিমানের মূল কন্ট্রোল সারফেসগুলির ওপর থেকে পাইলটদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গিয়েছিল। এই চার সেকেন্ডের সময়সীমায় বিমানের এলিভেটর এবং এলিয়রনগুলি পাইলটের কোনো ধরনের কমান্ড বা নির্দেশ ছাড়াই নিজে থেকেই অস্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করতে শুরু করে। প্রসঙ্গত, এলিভেটর মূলত বিমানের নাক অংশ ওপরে তুলতে বা নিচে নামাতে সাহায্য করে এবং এলিয়রন ডানা ঝুঁকিয়ে বিমানকে সঠিক দিকে বাঁক নিতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে হাইড্রোলিক সিস্টেম বিকল হয়ে যাওয়ায় বিমানের স্পয়লারগুলিও সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে, যা আদতে লিফট কমিয়ে বিমানকে নিরাপদে নামাতে বা গতি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত জরুরি ভূমিকা পালন করে।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঠিক পরেই বিমান সংক্রান্ত একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসে। জানা যায়, ওই ফুকেত-দিল্লি ফ্লাইটের পাইলট-ইন-কমান্ড সফলভাবে বিমান ল্যান্ড করার পর পরপর দুটি ইউরিন টেস্ট বা প্রস্রাব পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। তাঁর শরীর থেকে গাঁজা বা মারিজুয়ানার মতো মারাত্মক মাদকের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল। শুধু তাই নয়, ওই একই বিমানের এক কেবিন ক্রুও অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলে জানিয়েছিলেন যে, সংশ্লিষ্ট পাইলট নাকি এর আগে ডিউটির মধ্যেও মাদক সেবন করেছিলেন। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসার পরেই একপ্রকার নড়েচড়ে বসে এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ। সংস্থার নতুন ও কঠোর স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP)-এর বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবে সংস্থার সমস্ত পাইলট ও ক্রু সদস্যদের জন্য নিয়মিত ড্রাগ টেস্ট করানোর কঠোর নির্দেশিকা জারি করা হয়।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই তিনশোরও বেশি এয়ার ইন্ডিয়া পাইলট এই বাধ্যতামূলক ড্রাগ পরীক্ষার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। সাধারণত এই ধরনের চূড়ান্ত ড্রাগ টেস্টের বিশ্বস্ত ল্যাবরেটরি রিপোর্ট হাতে আসতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। এর আগে বিমান সংস্থার পক্ষ থেকে সাফাই দিয়ে জানানো হয়েছিল যে, সুনির্দিষ্ট কোনো বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়াই সার্বিক অসামরিক বিমান পরিবহণ নিয়মের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতি রেখেই ক্রু সদস্যদের এই রুটিন ড্রাগ টেস্ট করানো হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একের পর এক পাইলটের মাদক পরীক্ষায় ফেল করার ঘটনায় এয়ার ইন্ডিয়ার সুরক্ষা মান নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন জোরালো হয়েছে।