সেবির বড় চালে রাতারাতি বদলাচ্ছে শেয়ার বাজারের নিয়ম! ছোট মামলায় কি এবার মিলবে বড় স্বস্তি?

পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া বা সেবি (SEBI) শুক্রবার তাদের বিদ্যমান সেটেলমেন্ট বা নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় এক সুদূরপ্রসারী ও ব্যাপক পরিবর্তনের প্রস্তাব পেশ করেছে। বাজারের দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে আইনি ও নিয়ামकीय মামলাগুলোর নিষ্পত্তি আরও দ্রুত, সহজ এবং স্বচ্ছ করার লক্ষ্যেই এই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেবির পক্ষ থেকে প্রকাশিত নতুন পরামর্শপত্রে मौजूदा ‘সেবি (সেটেলমেন্ট প্রসিডিংস) রেগুলেশন, ২০১৮’-র পরিবর্তে একটি সম্পূর্ণ নতুন আধুনিক কাঠামো নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে, যা আগামী দিনে দেশের আর্থিক বাজারকে আরও গতিশীল করে তুলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সেবির এই নতুন প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিষ্পত্তি রাশিযুক্ত মামলাগুলোর জন্য একটি নতুন ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা। এই বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে ছোট অঙ্কের মামলার ক্ষেত্রে উচ্চাधिकार প্রাপ্ত উপদেষ্টা কমিটি (HPAC)-এর দীর্ঘ বৈঠকের আর কোনো প্রয়োজন পড়বে না। পরিবর্তে, এই ধরনের মামলাগুলো সরাসরি অভ্যন্তরীণ কমিটির মাধ্যমে পূর্ণ সময়ের সদস্যদের প্যানেলের কাছে পাঠিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। এছাড়া, একাধিক নিয়ামकीय কার্যপ্রক্রিয়া একসঙ্গে নিষ্পত্তি করার সময় যে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ চার্জ বা জরিমানা দিতে হতো, তাও তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে মামলার দীর্ঘ জট কাটবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দ্রুত আইনি ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবে।

নতুন নিয়মে অপরাধের গুরুত্ব এবং মামলার ধরন অনুযায়ী জরিমানা ও সেটেলমেন্ট পরিমাণের অনুপাতও যৌক্তিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেবির অতীতের বিভিন্ন কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, অতীতে বহু ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত সেটেলমেন্টের পরিমাণ চূড়ান্ত জরিমানার তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি ছিল। নতুন প্রস্তাবিত কাঠামোতে এই অসামঞ্জস্য কমিয়ে তা প্রায় চার গুণের কাছাকাছি নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সেটেলমেন্টের পরিমাণকে দেশের বিভিন্ন সিকিউরিটিজ আইনের নির্ধারিত ন্যূনতম জরিমানার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে আবেদনকারীর শ্রেণি অনুযায়ী নির্দিষ্ট গুণক বা মাল্টিপ্লায়ার কার্যকর হবে। তবে বেআইনিভাবে অর্জিত লাভ বা বিনিয়োগকারীদের সরাসরি ক্ষতির অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া কঠোরভাবে আগের মতোই জারি থাকবে।

আবেদনকারীদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য নিয়ামক সংস্থাটি তাদের নীতিতে বেশ কিছু মানবিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। সেবি এবার স্বস্তিদায়ক বা প্রশমনকারী কারণের (Mitigating Factors) সর্বোচ্চ সংখ্যা ৩ থেকে বাড়িয়ে ৫টিতে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এবং আবেদনকারীর একজন স্বাধীন পরিচালক হওয়ার মতো বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি, অবৈধ মুনাফা ফেরতের ক্ষেত্রে সুদের হার নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো চূড়ান্ত আদেশ জারি না হয়ে থাকে, তবে লেনদেনের তারিখ থেকে আবেদন দাখিল করা পর্যন্ত বার্ষিক ৯ শতাংশ হারে সুদ ধার্য করা হবে। অন্যদিকে, চূড়ান্ত আদেশ পাস হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে লেনদেনের তারিখ থেকে আদেশ পর্যন্ত ৯ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে আবেদন দাখিল করা পর্যন্ত ১২ শতাংশ বার্ষিক সুদ প্রযোজ্য হবে। তবে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, বকেয়া সুদের ওপর কোনো কম্পাউন্ড ইন্টারেস্ট বা সুদের ওপর সুদ নেওয়া হবে না।

দীর্ঘদিনের পেন্ডিং বা অমীমাংসিত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে আবেদন জমা দেওয়ার জন্য বর্তমানে নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা বাড়ানোরও প্রস্তাব দিয়েছে সেবি। এই বহুমুখী সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মতামত ও পরামর্শ আহ্বান করা হয়েছে। বাজারের স্বচ্ছতা বজায় রেখে অপরাধের সঠিক শাস্তি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার এই উদ্যোগকে দেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।