রাস্তার নামেই কি শেষ বিপ্লবী দীনেশের স্মৃতি? ইছামতীর পাড়ে ধুঁকছে ফাঁসির মঞ্চের নায়কের ভিটে!

স্বাধীনতা মানেই কি শুধু রাস্তার নামকরণে সীমাবদ্ধ থাকা? বসিরহাটের ইছামতীর পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা এখন প্রতিধ্বনি তুলছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিযুগের বিপ্লবী দীনেশচন্দ্র মজুমদারের নাম এখন শহরের প্রধান রাস্তায় জ্বলজ্বল করছে ঠিকই, কিন্তু যে ভিটেয় জন্মেছিলেন এই বীর যোদ্ধা, সেই পৈতৃক বাড়িটি আজ ধ্বংসের মুখে। স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরেও তাঁর এই জন্মভিটে সংরক্ষণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন স্থানীয় মানুষ।

১৯০৭ সালের ১৯ মে ইছামতীর তীরে জন্ম নেওয়া দীনেশচন্দ্র মজুমদার যোগ দিয়েছিলেন ‘যুগান্তর’ বিপ্লবী সংগঠনে। কলকাতা পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টকে হত্যার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মেদিনীপুর জেলের সুউচ্চ প্রাচীর টপকে পালানো—দীনেশের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বাধীনতার লড়াইয়ের অবিস্মরণীয় উপাখ্যান। ১৯৩৩ সালে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের আস্তানায় ধরা পড়ার পর ১৯৩৪ সালের ৯ জুন মাত্র ২৭ বছর বয়সে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। যে যুবক হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, আজ তাঁর সেই জন্মভিটেই বিস্মৃতির গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে বাড়িটির অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পুরনো দেওয়ালে বিশাল ফাটল, খসে পড়ছে প্লাস্টার, আর ছাদের পরতে পরতে গজিয়ে উঠেছে অশ্বত্থের শিকড়। স্থানীয় ‘শহিদ দীনেশ মজুমদার স্মৃতিরক্ষা কমিটি’-র সাধারণ সম্পাদক অজয় বাইন আক্ষেপ করে বলেন, “রাস্তার নামকরণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটা কি শহিদের আত্মত্যাগের একমাত্র স্বীকৃতি হতে পারে?” অধ্যাপক ড. জগন্নাথ দাস ও সমাজকর্মী প্রদীপ্ত সরকারের মতে, শুধু নামফলক দিয়ে ইতিহাস বাঁচে না। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে এই বাড়িটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে সেখানে একটি স্মৃতি-সংগ্রহশালা এবং লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে।

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে যখন গোটা দেশ দেশাত্মবোধক গানে মুখর, তখন বসিরহাটের ইছামতীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই জীর্ণ বাড়িটি যেন এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে দেওয়ালে ফাটল বাড়ছে, ইতিহাসের প্রতিটি ইট খসে পড়ছে অবহেলার ভারে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন—স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই দিনগুলোর স্মৃতি কি এভাবেই ধুলোয় মিশে যাবে? নাকি সরকার উদ্যোগী হবে এই অমর শহিদের জন্মভিটে সংরক্ষণ করতে? নীল-সাদা ফলকের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া এই বাড়িটিই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামের জীবন্ত পাঠশালা। শহরবাসী এখন শুধু উত্তরের অপেক্ষায়।