খটখট শব্দে ফুসছে শূন্যতা! বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প হারিয়ে যাওয়ায় কেন পথে বসছেন শিল্পীরা?

বাংলার শতবর্ষের প্রাচীন গর্ব ও ঐতিহ্য হস্তচালিত তাঁতশিল্প আজ চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বিলুপ্তির পথে। শান্তিপুর ও ফুলিয়ার ঘরে ঘরে একসময় যে তাঁতের খটখট শব্দ শোনা যেত, তা আজ স্তব্ধ হওয়ার উপক্রম। পাওয়ারলুম বা যন্ত্রচালিত তাঁতের অনিয়ন্ত্রিত অনুপ্রবেশ, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং সরকারি এনফোর্সমেন্ট বিভাগের চরম নিষ্ক্রিয়তার কারণে কাজ হারিয়ে বাধ্য হয়ে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন এ রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী তাঁতিরা।

তাঁত শিল্পীদের অভিযোগ, ২০১৬-১৭ সালের পর থেকেই বাজারে পাওয়ারলুম কাপড়ের আধিপত্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। আইন অনুযায়ী হস্তচালিত তাঁতের জন্য নির্দিষ্ট বস্ত্র সংরক্ষিত থাকলেও, ২০১৮ সালের পর থেকে সেই নিয়ম পুরোপুরি শিকেয় উঠেছে। টেক্সটাইল দফতরের আওতাভুক্ত এনফোর্সমেন্ট বিভাগ ফিল্ডে নেমে কোনো কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা অভিযান না চালানোয় আইন অমান্য করেই রমরমিয়ে চলছে পাওয়ারলুমের ব্যবসা। এমনকী স্থানীয় পঞ্চায়েত বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে পাওয়ারলুমের লাইসেন্স দেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগও উঠেছে। তাঁত আন্দোলনকারী হরপদ বসাকের দাবি, হস্তচালিত তাঁত সমবায় সমিতির শীর্ষ সংস্থা ‘তন্তুজ’-এও বর্তমানে পাওয়ারলুমের কাপড় বিক্রি হচ্ছে। বেঁচে থাকার বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার পরিবার বাধ্য হয়ে পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হচ্ছেন। সুতো ও তাঁতের নিপুণ কারিগররা পরিবার ছেড়ে আসাম, দক্ষিণ ভারতসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে দিনমজুর বা অন্য কম মজুরির কাজের খোঁজে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কায়িক পরিশ্রমে অভ্যস্ত না হওয়ায় পরবাসে গিয়ে তাদের জীবনসংগ্রাম আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। প্রবীণ হস্তশিল্পীদের জোরালো দাবি, কাগজে-কলমে থাকা আইন ও শাস্তির বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সরকার ও প্রশাসনের প্রকৃত সদিচ্ছা ছাড়া এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক কিছু নীতিগত প্রতিশ্রুতিতে এখনও কিছুটা আশার আলো দেখছেন ধুঁকতে থাকা তাঁতিরা। তাদের একটাই দাবি, দ্রুত সরকারি নজরদারি বাড়িয়ে পরিযায়ী তাঁতিদের ঘরে ফিরিয়ে আনা হোক এবং বাংলার গৌরবময় হস্তচালিত তাঁতশিল্পকে পুনরায় পুনরুজ্জীবিত করা হোক।