টাটা সাম্রাজ্যের মসনদে কি ফিরছে টাটা পরিবারই? চন্দ্রশেখরনের পদত্যাগের পর জল্পনা তুঙ্গে!

দেশের সর্বকালের সর্ববৃহৎ ও প্রভাবশালী উদ্যোগপতিদের নাম বলতে গেলে সবার প্রথমেই যে নামটি মনে আসে, তিনি হলেন কিংবদন্তি রতন টাটা। তাঁর নাম এবং ব্যক্তিত্বই ছিল এই সুবিশাল শিল্পগোষ্ঠীর চূড়ান্ত পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট। রতন টাটার অবর্তমানে সুদীর্ঘ সময় ধরে টাটা সন্সের মূল পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলাচ্ছিলেন এন চন্দ্রশেখরন। সুদীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই মর্যাদাপূর্ণ সংস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। তবে সকলের সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নিজের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর বা ইস্তফা দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন এন চন্দ্রশেখরন। আর তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগের পরই গোটা দেশের শিল্পমহলে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে—এবার তবে ঠিক কার কাঁধে উঠবে টাটা সন্সের সর্বময় দায়িত্ব?

টাটা গ্রুপের কর্পোরেট নেতৃত্বে যে এক বিরাট ও যুগান্তকারী পরিবর্তন হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। বুধবার টাটা গোষ্ঠীর শীর্ষ পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছেন এন চন্দ্রশেখরন। টাটা গ্রুপের অন্দরে অত্যন্ত জনপ্রিয়ভাবে ‘চন্দ্র’ নামে পরিচিত চন্দ্রশেখরন প্রায় এক দশক ধরে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল দায়িত্ব সফলভাবে পালন করার পর অবশেষে সরে দাঁড়ানোর পথ বেছে নিলেন। কেন তিনি আর একটি অতিরিক্ত মেয়াদের জন্য নিজের নাম প্রস্তাব করছেন না এবং দায়িত্বে থাকতে ইচ্ছুক নন, সেই বিষয়ে তাঁর পদত্যাগপত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যাখাও প্রদান করেছেন। তবে তাঁর এই প্রস্থানের পর থেকেই সবচেয়ে বড় এবং তীব্র প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে যে, টাটা সন্সের পরবর্তী কর্ণধার বা চেয়ারম্যান কে হতে চলেছেন?

এই নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ও কর্পোরেট মহলে যখন তীব্র জল্পনা চলছে, ঠিক সেই সময়ই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম ‘ফরচুন’-এর একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসাবে সবার আগে উঠে এসেছে নোয়েল টাটার নাম। ওই বিশেষ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া বা আরবিআই (RBI) যদি শেষ পর্যন্ত টাটা সন্সকে একটি বাধ্যতামূলক আইপিও (IPO)-র মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয় এবং চাপ সৃষ্টি করে, তবে নোয়েল টাটা সংস্থার সার্বিক স্বার্থে টাটা সন্সের বোর্ড পুনর্গঠন করতে পারেন এবং নিজে সরাসরি চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারেন। এর ফলে ১৭০ বিলিয়ন ডলারের সুবিশাল টাটা গোষ্ঠীর ওপর পারিবারিক তথা টাটা পরিবারের ঐতিহাসিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, নোয়েল টাটা বর্তমানে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ টাটা ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। এই টাটা ট্রাস্টের হাতেই টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ মালিকানা বা অংশীদারি সুরক্ষিত রয়েছে। তবে বর্তমান প্রচলিত পরিচালন কাঠামো এবং পর্ষদের ডিরেক্টরদের মনোনয়নের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির ক্ষেত্রে টাটা সন্সের ওপর এই ট্রাস্টের প্রত্যক্ষ প্রভাব সব সময় থাকে না। বর্তমানে নোয়েল টাটা এবং বেণু শ্রীনিবাসন টাটা ট্রাস্টের মনোনীত বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে টাটা সন্সের বোর্ডে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে অবস্থান করছেন। যেকোনো নীতিগত বা বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁদের নির্দিষ্ট ভেটো ক্ষমতাও সুনিশ্চিত রয়েছে।

তবে টাটা সন্স যদি ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তবে সেখানে সাধারণ খুচরো বিনিয়োগকারীরাও প্রত্যক্ষ অংশীদার হয়ে উঠবেন। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ, সংস্থার ওপর বাড়তি তথ্য প্রকাশের কঠোর বাধ্যবাধকতা এবং সরকারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে টাটা ট্রাস্ট এবং খোদ টাটা পরিবারের হাতে থাকা নিরঙ্কুশ প্রভাব কিছুটা হলেও দুর্বল বা খর্ব হয়ে যেতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা রয়েছে। ইতিপূর্বে নোয়েল টাটা নিজেই টাটা সন্সের এই সম্ভাব্য তালিকাভুক্তির ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর মূল যুক্তি ছিল যে, এই হোল্ডিং সংস্থাটি যদি বেসরকারি বা প্রাইভেট হিসেবেই সম্পূর্ণ বজায় থাকে, তবে টাটা ট্রাস্ট দীর্ঘমেয়াদী কর্পোরেট কৌশল এবং সুনির্দিষ্ট মূলধন বণ্টনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে টাটা গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত জনকল্যাণমূলক ও সামাজিক উদ্দেশ্যগুলিও নির্বিঘ্নে বজায় রাখা সম্ভব হবে।