“আদালতকে কি তামাশা ভেবেছেন?” প্যাকেটজাত খাবারে ওয়ার্নিং লেবেল নিয়ে FSSAI-কে সুপ্রিম কোর্টের চরম ভর্ৎসনা!

প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত নুন, চিনি কিংবা স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে কি না, তা গ্রাহককে স্পষ্ট করে জানাতে হবে। কিন্তু সেই ‘সামনের দিকের সতর্কতা-লেবেল’ বা ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ ওয়ার্নিং লেবেল (FOPL) চালু করার ক্ষেত্রে কেন এত দীর্ঘসূত্রিতা ও দেরি হচ্ছে? এই গুরুত্বপূর্ণ ও জনস্বার্থের প্রশ্নে এ বার খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা FSSAI এবং কেন্দ্র সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া অবস্থানের ফলে প্যাকেটজাত খাবারের লেবেলিং নিয়ে প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও চাপ তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি ছিল। বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের সমন্বিত বেঞ্চ শুনানির সময় কেন্দ্রের ভূমিকা ও দীর্ঘ কালক্ষেপণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মামলার শুনানিকালে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ব্রিজেন্দ্র চাহারকে সরাসরি আক্রমণ করে বিচারপতি পারদিওয়ালা অত্যন্ত কড়া ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, “আপনারা কি আদালতকে তামাশা ভাবছেন?” একই সঙ্গে তাঁর দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য, “সরকার কি তবে চায় না যে দেশের সাধারণ মানুষ সুস্থ থাকুক?” আদালতের এই রোষে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে জনস্বাস্থ্যের মতো একটি অতি সংবেদনশীল বিষয়কে কোনোভাবেই হালকাভাবে নিতে নারাজ শীর্ষ আদালত।

উল্লেখ্য, প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে এই ধরনের সতর্কতামূলক লেবেল বাধ্যতামূলক করার দাবিতে ‘3S অ্যান্ড আওয়ার হেলথ সোসাইটি’ নামে একটি জনকল্যাণমূলক ট্রাস্টের দায়ের করা মামলার শুনানি চলছিল। মামলাকারীদের মূল বক্তব্য ছিল, প্যাকেটের ঠিক সামনের অংশেই যাতে সহজে চোখে পড়ার মতো সতর্কবার্তা থাকে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে বাজারে বিক্রি হওয়া কোনো খাবারে যদি অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি, নুন বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট থেকে থাকে, তবে তা সাধারণ ক্রেতা কেনার আগেই স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন।

বিশেষ করে দেশের কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ এবং স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত। বিচারপতিরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, বর্তমান সময়ে ছোটদের মধ্যে জাঙ্ক ফুডের প্রতি আসক্তি বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলস্বরূপ, খাবারের প্যাকেটের গায়ে যদি স্পষ্ট এবং বড় করে সতর্কবার্তা থাকে, তবে অভিভাবক এবং শিশু উভয় পক্ষই কোনো খাদ্যপণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ও সঠিক তথ্য হাতে পাবেন। আদালতের মতে, সাধারণ মানুষের সচেতনতার স্বার্থেই এই নিয়ম দ্রুত কার্যকর করা দরকার।

আদালত আরও জানিয়েছে যে, এই নির্দিষ্ট বিষয়ে ইতিপূর্বে দেওয়া আদালতের আগের নির্দেশ সত্ত্বেও কাজের অগ্রগতি কার্যত শূন্যের কোঠায়। বিচারপতি পারদিওয়ালার অত্যন্ত জোরালো প্রশ্ন ছিল, “আমরা জনস্বার্থে এই বিষয়টি দেখছি। মনে রাখবেন, নিজেদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে করছি না। আমাদের নির্দেশ কেন মানছেন না? আমরা খুব ভালো করেই জানি যে আপনাদের উপরে বিভিন্ন মহলের চাপ রয়েছে!” এখানেই না থেমে, রীতিমতো হুঁশিয়ারির সুরে এরপর আদালত জানতে চায় যে, তারা নিজেরাই কি এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, নাকি বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করতে আদালতকে কঠোর নির্দেশ জারি করতে হবে?

মামলাকারীদের পক্ষ থেকে আদালতে জোরালো দাবি তোলা হয়েছে যে, দেশে বর্তমানে অসংক্রামক রোগের বোঝা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ডায়াবিটিস, স্থূলতা, হৃদ্‌রোগ এবং বেশ কিছু মারাত্মক ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে যে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত চিনি, নুন ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তা চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত। সেই কারণেই সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করতে এবং তাদের সচেতন করতে খাবারের প্যাকেটের সামনেই বড় করে সহজবোধ্য সতর্কতা জানানোর এই জোরালো দাবি উঠেছে।

মামলায় আরও দাবি করা হয়েছে যে, দেশে জীবনযাপন-সম্পর্কিত রোগগুলো ইতিমধ্যেই এক ভয়াবহ ও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ক্রমবর্ধমান ডায়াবিটিস এ দেশে ক্রমে এক ভয়ংকর ‘নীরব মহামারি’র রূপ নিয়েছে। এই সার্বিক পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এবং সুরক্ষিত রাখতে খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে সহজবোধ্য ও স্পষ্ট সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি বলে মামলাকারীরা মনে করেন। আজকের এই শুনানির পর সুপ্রিম কোর্টের কড়া অবস্থানের জেরে প্যাকেটজাত খাবারের লেবেলিং নীতি নিয়ে কেন্দ্র এবং FSSAI-এর উপর চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেল। এখন আগামী দিনে আদালতের পরবর্তী নির্দেশ কী আসে, সেদিকেই সজাগ দৃষ্টি রেখেছে দেশের স্বাস্থ্য ও খাদ্যশিল্প মহল।