ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিল ব্যবসায়ী সেজে! ৩5 বছর পর জালে জম্মু রেলওয়ে বিস্ফোরণ মামলার মাস্টারমাইন্ড

দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর অপেক্ষার পর অবশেষে ঐতিহাসিক পরিণতি পেল ১৯৯১ সালের জম্মু রেলওয়ে স্টেশন বোমা বিস্ফোরণ মামলা। সেকালের সেই মর্মান্তিক ও ভয়াবহ হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন তিন জন নিরীহ মানুষ এবং আহত হয়েছিলেন অন্তত আঠারো জন। এই বহুমুখী আলোচিত মামলার একেবারে শেষ পলাতক অভিযুক্ত আলতাফ হুসেন শেখকে অবশেষে সফলভাবে গ্রেফতার করেছে রেল পুলিশ। ধৃত আলতাফ দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার মারহামা-বিজবেহাড়ার বাসিন্দা এবং নাজির আহমেদ শেখের পুত্র। দীর্ঘ এতগুলি বছর ধরে সে নিজের আসল পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে একেবারে সাধারণ এক ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে ওই এলাকায় আত্মগোপন করে বসবাস করছিল। চলতি সপ্তাহের ঠিক প্রথমার্ধেই অনন্তনাগ থেকে তাকে পাকড়াও করার পর সরাসরি আদালতে তোলা হয় এবং তার বিরুদ্ধে কঠোর ‘টাডা’ (TADA) আইনের ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার সঠিক সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৯১ সালের ২ এপ্রিল। সেই নির্ধারিত দিনে জম্মু রেলওয়ে স্টেশনের ব্যস্ত ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে আলতাফ শেখ ও তার সহযোগীরা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায়। এই আকস্মিক ট্র্যাজেডিতে দুই জন বীর আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ান এবং এক সাধারণ নাগরিক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। প্রাথমিক দফার তদন্তে আমান উল্লাহ খান নামের এক অভিযুক্তকে পুলিশি জালে বন্দি করা সম্ভব হলেও, মূল অভিযুক্ত আলতাফসহ বাকি তিন জন দীর্ঘকাল গা ঢাকা দিয়ে থাকে। পরবর্তীতে দেশের বিশেষ আদালত তাদের প্রত্যেকেই ‘ফেরার অপরাধী’ বা প্রোক্লেমড অফেন্ডার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাল ছাড়েনি; প্রায় দু’বছর আগে গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ (GRP) তাকে হদিশ করতে নতুন করে বিশেষ অপারেশন বা টাস্কফোর্স অপারেশন শুরু করেছিল। কঠোর গোয়েন্দা তল্লাশি এবং স্থানীয় পরিচয় ও রেসিডেন্সিয়াল রেকর্ডের অত্যন্ত সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পরই অবশেষে বিজবেহাড়ায় তার হদিশ মেলে। এই চাঞ্চল্যকর গ্রেফতারির মাধ্যমে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীন এবং অমীমাংসিত একটি সন্ত্রাসবাদী মামলার সফল আইনি ইতি টানল রেলওয়ে পুলিশ।
জিআরপির এক শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক এই অভাবনীয় সাফল্য প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “এই গ্রেফতারি আরও একবার একটি চিরন্তন ও অবধারিত সত্যকে প্রমাণ করল— বিচার মিলতে কিছুটা দীর্ঘ সময় লাগতে পারে, কিন্তু বিচারকে কখনোই চিরতরে অস্বীকার করা যায় না। আইনের সুদীর্ঘ হাত থেকে কোনো অপরাধীই শেষ পর্যন্ত রেহাই পায় না।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সরকার অতীতের একাধিক অমীমাংসিত ও পুরোনো বড় সন্ত্রাসবাদী মামলা নতুন করে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং রি-ওপেন করার জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তালিকায় রয়েছে ১৯৯০ সালের বিখ্যাত কাশ্মীরি পণ্ডিত তথা বিশিষ্ট কবি-গবেষক সর্বানন্দ কৌল প্রেমী এবং তাঁর মেধাবী পুত্র বীরেন্দ্র কৌলের রোমহর্ষক অপহরণ, অমানবিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। একাধারে খ্যাতনামা কবি, নির্ভীক সাংবাদিক, স্বাধীনতাসংগ্রামী ও সমাজসংস্কারক সর্বানন্দ কৌলের কুখ্যাত খুনিদেরও ইতিমধ্যেই নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সরকারি সূত্র মারফত খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি, এই একই সংবেদনশীল তালিকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ১৯৯০ সালে শ্রীনগর শহরের বুকে নার্স সরলা ভাটকে নির্মমভাবে অপহরণ, পাশবিক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও নাড়িয়ে দেওয়া মামলাগুলিও।