আজই চিরতরে থেমেছিল অদম্য এক বিপ্লবীর পথচলা! কেন ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন ভিকাজি কামা?

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে কটি নাম অত্যন্ত গৌরব ও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিপ্লবের অগ্রদূত মাদাম ভিকাজি কামা। প্রতি বছর ১৩ আগস্ট দিনটিতে এই মহীয়সী নারীর প্রয়াণ দিবস পালিত হয়। তিনি কেবল দেশেই নয়, বরং সুদূর প্রবাসে বসেও ভারতীয় স্বাধীনতার তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রথমবার গর্বের সঙ্গে ভারতীয় পতাকা উড়িয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। নিজের অসীম সাহসিকতা, অদম্য জেদ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে গেছেন।
মুম্বইয়ের এক ধনী ও অভিজাত পারসি পরিবারে ১৮৬১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভিকাজি কামার জন্ম হয়েছিল। তাঁর বাবা সোরাবজি ফ্রমজি প্যাটেল ছিলেন সেকালের একজন অত্যন্ত নামী ও সফল ব্যবসায়ী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি বিশেষ ঝোঁক থাকায় ভিকাজি ইংরেজি এবং ফ্রেঞ্চ ভাষার ওপর অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীকালে রুস্তম কামার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হলেও সেই দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী বা সুখের হয়নি। ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৮৯৬ সালে যখন মুম্বইয়ে ভয়াবহ প্লেগ মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। সেই মহামারীর দিনে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যেভাবে দিনরাত সেবা করেন, তা তাঁর জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
রোগাক্রান্ত মানুষের ওপর ব্রিটিশ সরকারের নিষ্ঠুরতা এবং ভারতীয়দের প্রতি তাদের চরম বর্ণবিদ্বেষ ও উদাসীনতা ভিকাজি কামার কোমল মনকে এক নিমেষে বিদ্রোহী করে তোলে। এরপর স্বাস্থ্যগত কারণে ১৯০5 সালে তিনি লন্ডনে পাড়ি জজম। সেখানে গিয়ে তাঁর দেখা হয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই দিকপাল ব্যক্তিত্ব দাদাভাই নওরোজি এবং শ্যামজি কৃষ্ণ ভার্মার সঙ্গে। শ্যামজি কৃষ্ণ ভার্মার বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়া হাউসে’র সংস্পর্শে এসে তিনি সরাসরি ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। ভিকাজি কামার জীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক এবং গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্তটি আসে ১৯০৭ সালের ২২ আগস্ট। জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে তিনি প্রথমবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের ত্রিবঙ্গ পতাকা উত্তোলন করেন। লাল, হলুদ ও সবুজ রঙের সেই পতাকায় ভারতের মুক্তির বার্তা ঘোষণা করে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বর্বরতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন এবং বিশ্বের দরবারে ভারতের স্বাধীনতার জোরালো দাবি উত্থাপন করেন।
ব্রিটিশ রাজের চোখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ‘বন্দে মাতরম’ নামক প্রতিবাদী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে তিনি স্বাধীনতার বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। তাঁর তেজস্বী কলম ও অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা ব্রিটিশ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, যে কারণে তাঁর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশদের কাছে মাথা নত না করে তিনি প্যারিসে চলে যান এবং সেখান থেকেই বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে রাখেন। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে অসুস্থ শরীরে ১৯৩৫ সালে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৩৬ সালের ১৩ আগস্ট এই বীর বিপ্লবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।