আব্রাহাম লিঙ্কনে ভয়াবহ সংকট! মার্কিন সেনার মানসিক অবস্থা নিয়ে প্রতিরক্ষা সচিবকে তোপ সিনেটরের!

মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘকালীন সামরিক মোতায়েন এবং রণতরীতে কর্মরত নাবিক ও সেনাসদস্যদের শোচনীয় দুরবস্থা নিয়ে এবার দেশের অভ্যন্তরেই তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মার্কিন সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন (সিভিএন-৭২) বিমানবাহী রণতরীর দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান এবং জাহাজে তীব্র রসদ সংকট, পয়ঃনিষ্কাশন বা প্লাম্বিং ব্যবস্থার চরম অবনতি এবং নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ভেঙে পড়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলি নিয়ে সরাসরি প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং ভারপ্রাপ্ত নৌ সচিব হাং কাও-এর কাছে কড়া জবাব তলব করেছেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ একটি তিন পৃষ্ঠার সংবেদনশীল চিঠি প্রকাশ করে নৌবাহিনীর এই অমানবিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিরক্ষা বিভাগকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই বিশাল বিমানবাহী রণতরীটি ইতিমধ্যেই ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে একটানা সমুদ্রে অবস্থান করছে।
সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা চিঠিতে সিনেটর ব্লুমেনথাল উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন যে, সাগরে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা জাহাজে সেনাসদস্যদের দৈনন্দিন রসদের তীব্র ঘাটতি, ত্রুটিপূর্ণ প্লাম্বিং ব্যবস্থা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতির খবর অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। প্রসঙ্গত, গত জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং কৌশলগত আধিপত্য বজায় রাখার অংশ হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে দক্ষিণ চীন সাগরের পূর্বনির্ধারিত মহড়া থেকে হঠাৎ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল। এর আগে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড (সিভিএন-৭৮) রণতরীটির চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ৩২৬ দিন সমুদ্রে কাটিয়ে দেওয়ার নজিরও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। মার্কিন নৌবাহিনীর প্রচলিত নিয়ম ও গাইডলাইনের কঠোর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, সমুদ্রে যেকোনো যুদ্ধজাহাজের মোতায়েন বা অবস্থান কোনোক্রমেই ছয় মাসের বেশি দীর্ঘায়িত হওয়া উচিত নয়, যা মূলত ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে বর্তমান সময়ের দীর্ঘতম ও রেকর্ড পরিমাণ মোতায়েন হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
সিনেটর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েন মার্কিন সৈন্যদের শারীরিক সহনশীলতা এবং মানসিক স্থায়িত্বের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার ফলে সেনাসদস্যদের মধ্যে চরম মানসিক ক্লান্তি ও অবসাদ দেখা দিচ্ছে। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে সিনেটররা প্রতিরক্ষা বিভাগের কাছে মোতায়েনের সময়সীমা, যুদ্ধপ্রস্তুতি এবং নাবিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির ওপর ভিত্তি করে মোট ছ’টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এর মধ্যে যুদ্ধজাহাজের সুনির্দিষ্ট অবস্থানের সময়কাল, কর্মরত নাবিকদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আসন্ন সামরিক অভিযানের জন্য নৌবাহিনীর সার্বিক প্রস্তুতি এবং পেন্টাগনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত নীতি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান মারাত্মক সামরিক উত্তেজনার মাঝে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কথার লড়াই ও দাবির পারদ ক্রমশ চড়তে শুরু করেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় জোরালো দাবি করেছেন যে হরমুজ প্রণালীর ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার এই একতরফা আধিপত্যের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই এবং তারা তাদের সামরিক প্রতিরোধ ও সংকল্প বজায় রাখবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তাল হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা গত এক সপ্তাহের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা নিয়ন্ত্রণের দাবির সঙ্গে জলপথের চরম বাস্তব পরিস্থিতির এই বিশাল ফারাক ওয়াশিংটনের কৌশলগত নীতি এবং নৌবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের সৃষ্টি করেছে। ইরানও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের ন্যায্য দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে কড়া প্রতিরোধ বজায় রাখবে এবং কৌশলগত এই জলপথ বন্ধ রাখার নিজেদের কঠোর অবস্থান থেকে কোনোভাবেই পিছু হটবে না।