কংগ্রেসের সঙ্গে কি তবে বিচ্ছেদ নিশ্চিত? স্পিকারের বৈঠকে কানিমোঝির উপস্থিতি নিয়ে দিল্লির রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য!

সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের সমাপ্তির ঠিক পরেই রাজধানী দিল্লিতে এক অভাবনীয় রাজনৈতিক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল দেশের রাজনৈতিক মহল। লোকসভার স্পিকারের ঐতিহ্যবাহী ও প্রথাগত চা-চক্র অনুষ্ঠানটি বয়কট করল কংগ্রেসসহ প্রায় সমস্ত প্রধান বিরোধী দল। তবে এই সম্মিলিত বয়কটের মাঝেই সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করে সকলের নজর কেড়ে নিলেন দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগম বা ডিএমকে (DMK) সাংসদ কানিমোঝি। বিরোধী শিবিরের ঐক্যকে তোয়াক্কা না করে তাঁর এই চা-চক্রে যোগ দেওয়া নিয়ে এখন জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র গুঞ্জন ও জল্পনা শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি হওয়ার পর লোকসভার স্পিকারের পক্ষ থেকে প্রথাগত এই চা-চক্রের আয়োজন করা হয়েছিল। সাধারণত এই ধরনের বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য থাকে শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যকার দূরত্ব ও তিক্ততা মুছে ফেলে একটি পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সহ এনডিএ শিবিরের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকলেও কংগ্রেস বা অন্য কোনো বিরোধী দলের কোনো ফ্লোর লিডার এতে অংশ নেননি। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সূত্র মারফত জানা গিয়েছে যে, স্পিকার প্রথাগত ভাষণ বা অধিবেশনের সার্বিক মূল্যায়ন সংক্রান্ত বক্তব্য না দেওয়ায় বিরোধী দলগুলি ক্ষুব্ধ হয়ে এই অনুষ্ঠান থেকে দূরত্ব বজায় রাখে।
প্রাথমিকভাবে বিরোধী দলগুলির যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মতো শীর্ষ কংগ্রেস নেতাদেরও এই বৈঠকে যোগ না দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিরোধী জোটের সেই সম্মিলিত বয়কটকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি একাই স্পিকারের চা-চক্রে উপস্থিত হন। শুধু তাই নয়, ইন্ডিয়া জোটের অন্য কোনো শরিক দল বা ডিএমকে-র অন্য কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকলেও, একমাত্র দক্ষিণ ভারতীয় ডিএমকে প্রতিনিধি হিসেবে তিনি এই বৈঠকে সক্রিয় অংশ নেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কানিমোঝির এই পদক্ষেপ নিছক কোনো সাধারণ উপস্থিতি নয়, বরং এটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং হিসাব কষা একটি বড় রাজনৈতিক চাল।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ। প্রথমত, সম্প্রতি দক্ষিণী রাজনীতিতে কংগ্রেসের সঙ্গে ডিএমকে-র সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং জোট ভাঙার জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ ভারতে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও একক প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখার লড়াই। তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় কারণ হলো লোকসভা আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিঅর্ডিনেশন (Delimitation) প্রক্রিয়া, যেখানে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির আসন সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রবল রাজনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ডিএমকে নেতৃত্ব খুব ভালো করেই উপলব্ধি করছে যে, কেবল অন্ধের মতো কংগ্রেসের সুরে সুর মিলিয়ে সংসদ বর্জন করা বা হইচই করলেই তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্বার্থ সুরক্ষিত হবে না।
এর পাশাপাশি, কেন্দ্রের শাসক দলের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্ত রাস্তা খোলা রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। কানিমোঝি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, আঞ্চলিক স্বার্থরক্ষার স্বার্থে তাঁরা অন্ধ বিরোধিতায় বিশ্বাসী নন। শাসক পক্ষ এবং লোকসভার স্পিকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই তাঁরা আগামী দিনে সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত বিলের বিরোধিতা বা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চান। সবমিলিয়ে, স্পিকারের চা-চক্রে কানিমোঝির এই একক উপস্থিতি কেবল বিরোধী শিবিরের ঐক্যে বড় ফাটলই ধরায়নি, বরং জাতীয় রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিয়ে গেল।