শোকে পাথর হয়ে মাঠে ফিরলেন লিওনেল মেসি! বাবাকে নিয়ে করা আবেগঘন পোস্টে কেঁদে ভাসল বিশ্ব

সদ্য বাবাকে হারিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের বরপুত্র লিওনেল মেসি। জন্মশহর রোজারিওতে বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সদ্য মিয়ামিতে ফিরেছেন তিনি। বাবাকে হারিয়ে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন এই আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। তাঁর কেরিয়ার ও ফুটবল চালিয়ে যাওয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই ফুটবল বিশ্বে তীব্র জল্পনা ও সংশয় শুরু হয়েছে। তবে শোকের পাহাড় মাথায় নিয়ে এবং মনের মধ্যে গভীর ক্ষত নিয়েই শোক কাটার আগেই আবার নিজের চেনা কর্মক্ষেত্রে ফিরে এলেন মেসি। বাবার প্রয়াণের পর এই প্রথমবার প্রতিযোগিতামূলক মাঠে নামলেন তিনি। ইন্টার মায়ামির জার্সিতে লিগস কাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে লিওঁর বিরুদ্ধে দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নামেন লিওনেল মেসি। দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাত কাটিয়ে তাঁকে সবুজ ঘাসের মাঠে পা রাখতে দেখে গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক দাঁড়িয়ে করতালিতে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। তবে মেসির এই আবেগঘন প্রত্যাবর্তনকে জয়ের রঙে রাঙাতে পারেনি তাঁর দল। শেষ মুহূর্তের নাটকীয় পরিস্থিতিতে গোল হজম করে লিওঁর কাছে ২-৩ গোলে হেরে মাঠ ছাড়তে হয় ইন্টার মায়ামিকে।

উল্লেখ্য, গত শনিবার আর্জেন্টিনার রোজারিওতে ৬৮ বছর বয়সে জীবনাবসান ঘটে মেসির বাবা হোর্হে মেসির। ছেলের বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ার গড়ে তোলার নেপথ্যে বাবার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অভিভাবক হিসেবেই নয়, দীর্ঘদিনের সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে মেসির বিশ্বস্ত এজেন্ট হিসেবেও অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছেন তিনি। বাবার এই আকস্মিক মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও দীর্ঘ বার্তা শেয়ার করে প্রথমবার নিজের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ্যে আনেন মেসি। তিনি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় লেখেন, ‘বাবা, তুমি আর নেই। এই নিষ্ঠুর সত্যটা আজও বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন যে, তোমায় আর কখনো দেখতে পাব না, তোমার সঙ্গে আর কোনোদিন কথা বলতে পারব না। আমি জানি তোমার শরীরিক কষ্ট হচ্ছিল, তাই হয়তো এই মুক্তি তোমার জন্য ভালো হয়েছে। কিন্তু তুমি ভীষণ তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে গেলে। আমাদের একসঙ্গে উপভোগ করার মতো এখনও অনেক কিছু বাকি ছিল।’

বাবার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মেসি। তিনি জানান, আসন্ন বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে তাঁকে মাঠে খেলতে দেখার জন্য তাঁর বাবা কতটা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। মেসি তাঁর পোস্টে আরও লেখেন, ‘বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগে থেকেই বাবার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হতে শুরু করে। আমার জীবনের সেটাই প্রথম কোনো বড় টুর্নামেন্ট ছিল, যেখানে আমার বাবা আমার পাশে মাঠে উপস্থিত থাকতে পারেননি। প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আমি অধীর আগ্রহে আমার বাবার বার্তার জন্য অপেক্ষা করতাম। বাবাকে আমি প্রতি মুহূর্তে ভীষণভাবে মিস করতাম। আমি বুঝতে পারছিলাম পরিস্থিতি সত্যিই খারাপের দিকে যাচ্ছে, তবুও নিজের মনে ভাবতাম, আমি যদি টুর্নামেন্টে যত দূর সম্ভব এগিয়ে যেতে পারি, তবে হয়তো বাবা সুস্থ হয়ে একটা ম্যাচ মাঠে বসে দেখার সুযোগ পাবেন। আমরা ফাইনালে পৌঁছেছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তুমি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারলে না।’

বাবাকে হারানোর যন্ত্রণার গভীরতা যে কতটা অসহ্য, তা মেসির প্রতিটি শব্দে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিজের ভবিষ্যৎ ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়েও তিনি গভীর সংশয়ের কথা প্রকাশ করেছেন। মেসি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘তোমাকে ছাড়া আমি কী করব, আমি সত্যি কিছু জানি না। কীভাবে জীবন ও ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাব, তার কোনো দিশা পাচ্ছি না। আমি তো বরাবর শুধু ফুটবলটাই খেলে এসেছি। এখন আমার মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন ভিড় করছে। আমি আর কতদিন এই ফুটবল মাঠের লড়াই চালিয়ে যেতে পারব?’ বাবার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে তিনি জানান, হোর্হে মেসি কেবল তাঁর বাবা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু এবং পথপ্রদর্শক। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি বাবাকে পাশে পেয়েছেন। মেসি আরও লেখেন, ‘তুমি আমার বাবা ছিলে, বন্ধু ছিলে এবং আমার বিশ্বস্ত প্রতিনিধি ছিলে। আমার জীবনের একদম শুরু থেকে তুমি আমার পাশে ছিলে। সাফল্যের একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছতে আর খুব বেশি সময় বাকি ছিল না। তুমি আর একটু কেন অপেক্ষা করলে না? তাহলে আমরা দুজনে মিলে একসঙ্গে সেই শেষ সীমায় পৌঁছতে পারতাম।’ পরিশেষে বাবার প্রতি অন্তহীন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানিয়ে মেসি প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাঁর সন্তানকে মানুষ করার মধ্য দিয়েই তিনি সবসময় বাবার দেওয়া শিক্ষা ও আদর্শকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখবেন।