মালিকের মনখারাপ সত্যি বুঝেশুনে নেয় কুকুর! এই অবিশ্বাস্য দাবিতে শোরগোল বিজ্ঞান মহলে

মালিকের মনখারাপ বা চোখের জল কি সত্যি টের পায় পোষ্য কুকুর? এতদিন ধরে কেবল মানুষের অনুমান বা বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এবার এই প্রচলিত বিশ্বাসের সপক্ষে সরাসরি চোখ কপালে তোলা মস্তিষ্কবিজ্ঞানের অকাট্য প্রমাণ মিলল। সম্প্রতি সামনে আসা একটি নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানুষের মুখের নানান অভিব্যক্তি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে কুকুরের মস্তিষ্কে সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র ধরনের অনুভূতির সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ মানুষের মুখের হাসি, ভয়, রাগ কিংবা দুঃখ—কোনোটিকেই কুকুর আর দশটা সাধারণ দৃশ্যের মতো একইভাবে দেখে না।
অস্ট্রিয়ার স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটি অফ ভিয়েনা সহ বিশ্বের একাধিক প্রথমসারির প্রতিষ্ঠানের একদল গবেষক আধুনিক ফাংশনাল এমআরআই (fMRI) এবং উন্নত মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির যৌথ প্রয়োগ ঘটিয়ে কুকুরের মস্তিষ্কের এই দুর্দান্ত অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার প্রথম ধাপে মোট আটটি পোষ্য কুকুরকে মানুষের মুখের বেশ কিছু স্থির ছবি দেখানো হয়, যেখানে কখনও মানুষকে হাসিমুখ তো কখনও আবার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বা ভাবলেশহীন অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। পরীক্ষা করে দেখা যায়, মানুষের হাসিমুখ দেখলে কুকুরের মস্তিষ্কের বিশেষ বিশেষ অংশে এক অনন্য ধরনের সক্রিয়তা বা নিউরাল অ্যাক্টিভিটি তৈরি হয়। বিজ্ঞানীদের অভিমত, মানুষের হাসি কুকুরের কাছে কেবল একটি সাধারণ দৃশ্য বা ছবিমাত্র নয়—বরং এর সঙ্গে এক ধরনের ইতিবাচক আবেগ বা সুস্বাদু পুরস্কার পাওয়ার মতো আনন্দের অনুভূতিও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকতে পারে।
শুধু হাসিই নয়, কুকুর কি মানুষের রাগ, ভয় কিংবা দুঃখের মতো নেতিবাচক অভিব্যক্তিগুলিকেও একে অপর থেকে আলাদা করতে পারে? এই কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা চালান। প্রায় ১২টি কুকুরকে মানুষের হাসি, রাগ, ভয় এবং গভীর দুঃখের নানান অভিব্যক্তির ছবি দেখানো হয়। আধুনিক মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমের সাহায্যে গবেষকরা কুকুরগুলির মস্তিষ্কের বিভিন্ন সংবেদনশীল অংশের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন। গবেষণায় অবাক করার মতো তথ্য উঠে আসে—কুকুরের মস্তিষ্ক মানুষের সমস্ত নেতিবাচক অভিব্যক্তিকে এক বাক্যে এক বন্ধনীভুক্ত করে কেবল ‘খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করে না। বরং ভয়, রাগ এবং দুঃখের মতো আবেগগুলির ক্ষেত্রে কুকুরের মস্তিষ্কে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সুনির্দিষ্ট ধরনের নিউরাল অ্যাক্টিভিটি প্যাটার্ন তৈরি হয়।
বিশেষ করে মানুষের ভয় এবং রাগ বা দুঃখের মতো গভীর আবেগের মধ্যেকার সূক্ষ্ম পার্থক্য নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার জোরালো প্রমাণ এই গবেষণায় পাওয়া গিয়েছে। তবে গবেষকরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এর অর্থ এই নয় যে কুকুর মানুষের আবেগকে আক্ষরিক অর্থে হুবহু মানুষের মতো করেই অনুভব বা সম্পূর্ণ বুঝতে পারে। কারণ বাস্তব জীবনের কর্কশ বা সুন্দর পরিস্থিতিতে কুকুর কেবল মানুষের মুখাবয়ব দেখেই থেমে থাকে না। আমাদের গলার স্বর, শরীরের ভাষা বা ভঙ্গি, চলাফেরা এবং চারপাশের গন্ধ—এই সমস্ত কিছু একসঙ্গে ব্যবহার করেই তারা সম্পূর্ণ পরিস্থিতিটি বোঝার চেষ্টা করে থাকে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিগত হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের সান্নিধ্যে গৃহপালিত হওয়ার দীর্ঘ বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কুকুর মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস এবং যৌথভাবে সহযোগিতা করার জন্য এক প্রকার অসামান্য সামাজিক দক্ষতা অর্জন করেছে। মূলত মানুষের সঙ্গে কুকুরের এই দীর্ঘদিনের সহাবস্থানই তাদের মস্তিষ্ককে মানুষের নানান অভিব্যক্তির ভাষার সঙ্গে দ্রুত পরিচিত করে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
অবশ্য এই বিশেষ গবেষণায় শুধুমাত্র গৃহপালিত পোষ্য কুকুরদেরই পরীক্ষার আওতায় রাখা হয়েছিল। তাই খোলা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পথকুকুরগুলিও মানুষের রাগ বা দুঃখের মতো সূক্ষ্ম আবেগ একইভাবে বুঝতে সক্ষম হবে কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন। তা সত্ত্বেও, মানুষের সঙ্গে বন্য থেকে গৃহপালিত হওয়ার এই দীর্ঘ হাজার বছরের সম্পর্কই হয়তো তাদের মস্তিষ্ককে আমাদের আবেগের বহুমুখী ভাষার সঙ্গে কিছুটা হলেও পরিচিত করে তুলেছে।