শিকের আড়ালে বইয়ের আলো! জেলের কয়েদিরাই এখন মাস্টারমশাই, অবাক করা কান্ড আম্বালা জেলে

শিক্ষার আলো যে অন্ধকার দূর করতে পারে, তার এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী নজির স্থাপন করা হয়েছে আম্বালা সেন্ট্রাল জেলে। প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে এখন জেলের চার দেওয়ালের অন্দরেই শুরু হয়েছে এক অভিনব পাঠশালা, যেখানে বন্দীরা নিজেরাই শিক্ষক হয়ে শিক্ষা দান করছেন তাঁদের সহবন্দীদের। শিক্ষা শুধু মানবজীবনকে সমৃদ্ধই করে না, বরং নতুন দিকনির্দেশও দেখায়। এই একই দর্শন এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে হরিয়ানার আম্বালা জেলের অভ্যন্তরে। ভারত সরকারের উচ্চাভিলাষী ‘উল্লাস-নব ভারত সাক্ষরতা কর্মসূচি’ (ULLAS)-এর আওতায় স্থানীয় শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে জেলের নিরক্ষর বন্দীদের সাক্ষর করার এই অভাবনীয় উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে শিক্ষাদান করার জন্য বাইরে থেকে কোনো শিক্ষক নিয়োগ করা হয়নি; বরং জেলের অন্দরে বন্দি থাকা শিক্ষিত ব্যক্তিরাই স্বেচ্ছায় শিক্ষক হিসেবে এগিয়ে এসে অন্যদের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করছেন।

শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ সমীক্ষায় আম্বালা সেন্ট্রাল জেলের অভ্যন্তরে মোট ২৩৬ জন কয়েদিকে নিরক্ষর হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং ১৭ জন কয়েদিকে সাক্ষর বা শিক্ষিত বলে তালিকাভুক্ত করা হয়। পরবর্তী ধাপে, ওই ২৩৬ জন নিরক্ষর বন্দীকে ‘উল্লাস’ পোর্টালে শিক্ষার্থী হিসেবে এবং বাকি ১৭ জন শিক্ষিত বন্দীকে স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়। বর্তমানে এই ১৭ জন বন্দি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁদের সহবন্দীদের ক খ গ শেখাচ্ছেন। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো কারাবন্দী মানুষের জীবনের অন্ধকার দূর করে তাদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা। আম্বালা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সুধীর কালরা জানিয়েছেন যে এই পুরো প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এক দূরদর্শী ভাবনার ফসল, যার লক্ষ্য দেশকে সম্পূর্ণ সাক্ষর করে তোলা। জেলায় শিক্ষা বিভাগ নির্ধারিত ৩৪,০০০ জনের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে ইতিমধ্যেই ৩৫,০৫৪ জনের নাম উল্লাস পোর্টালে নথিভুক্ত করেছে।

কারাগারের এই ব্যতিক্রমী পাঠশালায় পাঠরত ২৩৬ জন বন্দিই আগামী সেপ্টেম্বর মাসে আয়োজিত হতে চলা জাতীয় উল্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন। এই পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর অংশগ্রহণকারী বন্দিরা ভারত সরকারের অনুমোদিত সরকারি শংসাপত্র লাভ করবেন। শিক্ষা বিভাগের তরফ থেকে কঠোরভাবে তদারকি করা হচ্ছে যাতে সংশোধনাগারের একজন নিরক্ষর বন্দিও এই পরীক্ষার বাইরে না থাকেন এবং প্রত্যেকেই অক্ষর জ্ঞান অর্জন করে নিজেদের জীবনকে সুন্দর করে তুলতে পারেন। সাধারণত কারাগার মানেই অপরাধের শাস্তি, অনুশোচনা এবং কঠোর বিধিনিষেধের বেড়াজাল। কিন্তু আম্বালা জেলের এই উদ্যোগ সেই চিরাচরিত ধারণাকে আমূল বদলে দিয়ে কারাগারের ভেতর এক পজিটিভ পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে শাস্তির বদলে বই, খাতা এবং কলমের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শিক্ষা বিভাগ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে এই প্রাথমিক সাক্ষরতা বন্দীদের মুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে এবং জীবিকা নির্বাহের পথ খুঁজে পেতে যুগান্তকারী সাহায্য করবে।