ঝাড়খণ্ডে ছাত্র বিক্ষোভে রক্তপাত! অনশনরত নেতার ওপর পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে ধুন্ধুমার, সরব রাজনৈতিক মহল

চাকরির পরীক্ষায় বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঝাড়খণ্ডে যে তীব্র ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা বর্তমানে এক চরম ও বিস্ফোরণ রূপ ধারণ করেছে। রাজ্যজুড়ে চাকরির পরীক্ষার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত নয় দিন ধরে আমরণ অনশনে বসেছিলেন বিশিষ্ট ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো। গত সোমবার আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীরা ঝাড়খণ্ড বিধানসভা ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে এক বিশাল অভিযান চালালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। জগন্নাথপুর মন্দিরের নিকটবর্তী এলাকায় বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ প্রশাসন নির্মমভাবে চড়াও হয়। শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান, কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং বেপরোয়া লাঠিচার্জ চালানো হয়, যার ফলে বেশ কয়েকজন পড়ুয়া এবং আন্দোলনকারী গুরুতর জখম হন। পুলিশের এই দমনপীড়ন ও নৃশংস লাঠিচার্জের জেরে ইতিমধ্যেই ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতোর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত অবনতি হয়েছে এবং বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করায় তাঁকে দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এই ন্যক্কারজনক পুলিশি হিংসার ঘটনার তীব্র নিন্দা করে ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ এক্স (যেটি পূর্বে টুইটার নামে পরিচিত ছিল) হ্যান্ডেলে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতোর সঙ্গে নিজের কথোপকথনের বিস্তারিত বিষয় তুলে ধরেছেন। অভিজিৎ লেখেন, “আমি দেবেন্দ্র মাহাতোর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। উনি গত নয় দিন ধরে অনশনে অনড় রয়েছেন। উনি আমাকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানিয়েছেন যে পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে উনি গুরুতর আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করায় ওঁকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।” ঝাড়খণ্ডের এই ঘটনাকে দিল্লির যন্তর মন্তরে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত ছাত্র বিক্ষোভের সঙ্গে একই বন্ধনীতে রেখে অভিজিৎ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, যন্তর মন্তর হোক কিংবা ঝাড়খণ্ডের রাজপথ—শিক্ষার্থীদের ওপর এ ধরনের প্রশাসনিক বর্বরতা অত্যন্ত নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
তিনি আরও সংযোজন করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) সর্বতোভাবে দেবেন্দ্র ভাই এবং তাঁর এই ঐতিহাসিক সংগ্রামের দৃঢ় পাশে রয়েছে। তিনি দেবেন্দ্র মাহাতোকে একজন ‘প্রকৃত বীর’ হিসেবে অভিহিত করে তাঁর অদম্য সাহস ও সংগ্রামী মানসিকতাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। এদিকে, এই পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ডের বর্তমান রাজনৈতিক মহলে তীব্র তরজা শুরু হয়েছে। ইন্ডি জোটের শরিক, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (JMM) এবং কংগ্রেস দলের যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকা হেমন্ত সোরেনের সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি প্রশ্ন তুলছে যে, রাজ্যের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যখন তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করার জন্য গণতান্ত্রিক উপায়ে পথে নেমেছে, তখন সরকার কেন তাদের সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ করছে।
উল্লেখ্য, ঝাড়খণ্ডের পাবলিক সার্ভিস কমিশন (JPSC) এবং স্টাফ সিলেকশন কমিশন (JSSC-CGL)-এর নিয়োগ পরীক্ষাগুলিতে ধারাবাহিক অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস এবং ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন পরীক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারী ছাত্রসমাজের মূল দাবি হলো, এই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সমস্ত বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল করে সিবিআই (CBI) বা অন্য কোনো নিরপেক্ষ তদন্তকারী সংস্থাকে দিয়ে উচ্চপর্যায়ের স্বচ্ছ তদন্ত করাতে হবে। সেইসঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিতেও অনড় রয়েছেন তাঁরা। হেমন্ত সোরেন সরকারের এই কঠোর পুলিশি দমননীতি এবং নির্বিচারে লাঠিচার্জের পর ঝাড়খণ্ডের রাজনৈতিক পারদ এখন চরমে পৌঁছেছে এবং রাজ্যজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধছে।