ধর্মস্থান থেকে মাইক খোলায় ফুঁসে উঠল কলকাতা হাইকোর্ট! রাজাবাজার মিছিলে বড় নির্দেশ বিচারপতির

ধর্মীয় স্থান থেকে মাইক খোলার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে কলকাতা হাইকোর্টে জোড়া মামলা দায়ের হয়েছে। এই সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে সরকারি ঘোষণার প্রতিবাদে আয়োজিত একটি মিছিলের বিষয়ে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দিয়েছেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য্য। মূলত জমিওত-ই-উলেমার একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে ১১ অগাস্ট রাজাবাজার থেকে মৌলালি পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিল করার অনুমতি চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়া হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, পুলিশ এই মিছিলে অনুমতি দিতে টালবাহানা করছে। সোমবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য্যর বেঞ্চে এই মামলার দীর্ঘ শুনানি হয় এবং আদালত শেষ পর্যন্ত বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে মিছিল করার অনুমতি প্রদান করে।

মামলার শুনানির সময় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, কিছু তথ্য গোপন রেখেই এই আবেদন করা হয়েছে। সপ্তাহের মাঝে এই ধরনের বড় মিছিল করার অনুমতি দেওয়া প্রশাসনের পক্ষে কঠিন। রাজ্যের যুক্তি ছিল, মিছিলে দুই হাজারের পরিবর্তে সর্বাধিক তিনশো জন উপস্থিত থাকতে পারেন এবং রুট পরিবর্তন করে গড়িয়া বাস স্ট্যান্ড থেকে এসসি মল্লিক রোড ও ইএম বাইপাস হয়ে মিছিল করলে প্রশাসনের কোনো আপত্তি থাকবে না। অন্যদিকে মামলাকারীর আইনজীবীর অভিযোগ ছিল, পুলিশ যদি নির্দিষ্ট কারণ বা শর্ত আগেই জানাত, তবে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। এমনকি অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমিয়ে রবিবারেও মিছিলের অনুমতি দেওয়া যেতে পারত বলে সওয়াল করা হয়।

পুলিশের এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য্য। তিনি তাঁর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, পুলিশ অন্য কোনো উদ্দেশ্যেই এই মিছিলের অনুমতি দিতে গড়িমসি করেছে। প্রশাসনের কাজের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি বলেন, বিগত ৩ আগস্ট অনুমতি চাওয়া হয়েছিল অথচ গত ৭ আগস্ট অর্থাৎ শুক্রবার রাত্রি সাড়ে আটটায় পুলিশ জানিয়ে দিল অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। এত দেরি করে সিদ্ধান্ত জানানোর কারণ কী? প্রশাসন চাইলে বিষয়টি আরও অনেক আগেই স্পষ্ট করতে পারত। এর আগে অন্য একটি মিছিলে মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল বলে পুলিশ যে যুক্তি দিয়েছে, তা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তোলে।

উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শোনার পর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য্য ১১ অগাস্ট নির্দিষ্ট কিছু কঠোর শর্তের অধীনে এই প্রতিবাদী মিছিল করার অনুমতি দেন। আদালতের বেঁধে দেওয়া প্রধান শর্তগুলির মধ্যে অন্যতম হলো— মিছিল অবশ্যই সকাল সাড়ে এগারোটা থেকে শুরু করে এক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া মিছিলে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বাধিক ৭৫০ জন উপস্থিত থাকতে পারবেন এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রতিবাদ মিছিলে কোনো ধরনের মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যাবে না। প্রশাসন ও আয়োজক উভয় পক্ষকেই এই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, ধর্মীয় স্থান থেকে মাইক সরানোর এই সরকারি সিদ্ধান্তের বৈষম্য ও বিরোধিতায় সোমবার কলকাতা হাইকোর্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে। আইনজীবী দানিশ ফারুকী এই মামলাটি করেছেন। একই সঙ্গে এই স্পর্শকাতর ইস্যুতে কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মামলা দায়ের করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সব মিলিয়ে ধর্মীয় স্থান থেকে মাইক খোলার এই প্রশাসনিক নির্দেশ ঘিরে আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে, যেদিকে গভীর নজর রয়েছে ওয়াকিবহাল মহলের।