মাছে-ভাতে বাঙালির পাতে বড় বিপদ! জলের ব্যাকটিরিয়া কীভাবে নষ্ট করছে আপনার সাধের মাছের স্বাদ?

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও, বর্তমান সময়ে খাবার টেবিলে মাছ নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েই চলেছে। বাজারে গিয়ে তাজা মাছ কিনে এনে ভালো করে ধুয়ে, লেবু, হলুদ ও নানা মশলা দিয়ে রান্নার পরেও খাবারে এক অদ্ভুত কাদা-কাদা বা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ থেকে যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বা এফএও-এর সাম্প্রতিক ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলজ প্রাণী ও মাছ চাষে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে এবং অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। মৎস্য খাতের এই ব্যাপক সাফল্যের পরও ভোক্তার প্লেটে গিয়ে মাছের স্বাদ ও তৃপ্তি নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে রয়েছে। এই অদ্ভুত দুর্গন্ধের আসল কারণ এবং এর সম্ভাব্য প্রতিকার নিয়ে সম্প্রতি দেশজুড়ে মৎস্যবিজ্ঞানীদের মধ্যে শুরু হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।

মৎস্য গবেষক ও বিজ্ঞানীদের মতে, চাষের মাছে পাওয়া এই তীব্র গন্ধের পেছনে দায়ী রয়েছে বিশেষ কিছু জৈব যৌগ, যা মাছের শরীরে চর্বি ও চামড়ার নিচের লাল মাংসে স্থায়ীভাবে জমা হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল হক জানিয়েছেন যে, পুকুরের বদ্ধ পানি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় সেখানে একজিনো ব্যাকটিরিয়া, মিকজো ব্যাকটিরিয়া এবং সায়ানো ব্যাকটিরিয়ার মতো ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়া জন্ম নেয়। এই ব্যাকটিরিয়াগুলো থেকে ‘জিওসমিন’ এবং ‘২-মিথাইলআইসোবোর্নিওল’ নামের দুটি জৈব যৌগ নিঃসৃত হয়। মূলত পুকুরে মাছের অতিরিক্ত ঘনত্ব, মাত্রাতিরিক্ত খাবার সরবরাহ এবং নিয়মিত পানি পরিবর্তন না করার প্রবণতাই এসব ব্যাকটিরিয়া বৃদ্ধির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অতিরিক্ত খাবার ও মাছের মলমূত্র পচে গিয়ে পুকুরের তলদেশে এক প্রকার ‘গন্ধের কারখানা’ তৈরি করে, যা মাছে শোষিত হয়।

গন্ধের এই সমস্যার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ার মতো গুরুতর তথ্যও উঠে এসেছে গবেষণায়। ২০২৩ সালে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ পরীক্ষায় দেখা গেছে, নাটোরের একটি বাণিজ্যিক খামারের মাছে সহনীয় সীমার চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। এফএও-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী খাবারে ক্রোমিয়ামের মাত্রা নির্দিষ্ট সীমার বেশি হলে তা মানবদেহের কিডনি ও যকৃতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। তবে আশার কথা হলো, বাঙালিরা সাধারণত কাঁচা বা আধাসিদ্ধ মাছ খান না, ফলে ভালোভাবে রান্না করলে ব্যাকটেরিয়াজনিত স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। তা সত্ত্বেও খাওয়ার সময় কাঙ্ক্ষিত তৃপ্তি নষ্ট হওয়ায় বিজ্ঞানীরা এখন আধুনিক ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম’ বা তলদেশ পরিষ্কার রাখার পদ্ধতি গ্রহণের জোরালো সুপারিশ করছেন, যাতে ভবিষতে মাছের মান ও সুস্বাদু ভাব বজায় রাখা যায়।