প্রশ্নফাঁস কি খুনের চেয়েও ভয়ানক? ছত্তিশগড় হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে শোরগোল!

ছত্তীসগড় হাইকোর্টের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নজিরবিহীন রায়ে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করা নিছক সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি কোনো মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার চেয়েও বহু গুণে বেশি ভয়ঙ্কর এবং জঘন্য। ছত্তীসগড় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (সিজিপিএসসি) প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর মামলায় গ্রেফতার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক জীবনকিশোর ধ্রুবর জামিনের আবেদন সম্পূর্ণ খারিজ করে দেওয়ার সময় এই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে আদালত। বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কোনো ব্যক্তিকে খুন করলে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেই শোকের পরিধি সীমিত থাকে; কিন্তু একটি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ার ফলে লক্ষ লক্ষ মেধাবী ও পরিশ্রমী চাকরিপ্রার্থীর সোনালী ভবিষ্যৎ, তাদের সুদীর্ঘ কেরিয়ার এবং সামগ্রিক সমাজব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়।
মামলার বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায় যে, ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সিজিপিএসসি-র বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যার গভীরে গিয়ে বর্তমানে তদন্ত চালাচ্ছে সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বা সিবিআই। সেই তদন্ত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন পিএসসি সচিব তথা অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার জীবনকিশোর ধ্রুবকে গ্রেফতার করেছিল কেন্দ্রীয় এই গোয়েন্দা সংস্থা। অভিযোগ উঠেছে যে, ২০২১ সালের পিএসসি মেইনস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কোনো গোপনীয়তা রক্ষা না করে সোজা নিজের ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এই শীর্ষ পদাধিকারী সরকারি আধিকারিক। সেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে বাড়িতে বসে মহড়া চালিয়েই পরীক্ষায় দুর্দান্ত সাফল্য অর্জন করেছিলেন তাঁর পুত্র এবং পরবর্তী কালে অত্যন্ত প্রভাবশালী অতিরিক্ত জেলাশাসক বা এডিএম পদে নিযুক্ত হন।
আদালতের শুনানির সময় সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে জোরালো প্রমাণ পেশ করে জানানো হয় যে, পরীক্ষার অনেক আগেই নিজের বাসভবনে বসে অন্তত চারটি বড় প্রশ্নের উত্তর টানা অভ্যাস করেছিলেন অভিযুক্তের পুত্র। শুধু তাই নয়, জীবনকিশোরের সরকারি বাসভবনে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে এই সমস্ত অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে জড়িত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও বাজেয়াপ্ত করেছেন গোয়েন্দারা। যদিও ধৃত সাবেক আইএএস-এর পক্ষে দাবি করা হয়েছিল যে, সেই সময় তিনি সচিবের দায়িত্বে ছিলেন বলেই তাঁকে এই মামলায় বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। তবে বিচারপতির বেঞ্চ অভিযুক্তের এই সমস্ত সাফাই ও যুক্তি সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেয়। গত ৩১ জুলাই এই মামলার শুনানি শেষ হওয়ার পর রায়দান স্থগিত রাখা হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট দিনে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে আদালত সাফ জানিয়ে দেয় যে, এ ধরনের অত্যন্ত গুরুতর অপরাধের সামাজিক অভিঘাত এতটাই ব্যাপক যে অভিযুক্তকে কোনো অবস্থাতেই জামিন দেওয়া সম্ভব নয়।
ছত্তীসগড় হাইকোর্টের এই কড়া ও স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ বর্তমান সর্বভারতীয় পেপার লিক বা প্রশ্নফাঁস পরিস্থিতির নিরিখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। জাতীয় স্তরে ইতিমধ্যেই নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কাণ্ড নিয়ে গোটা দেশজুড়ে চরম রাজনৈতিক তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ওই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে নেমে সিবিআই সম্প্রতি ৯৪ পাতার একটি বিশাল চার্জশিট জমা দিয়েছে এবং তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। পাশাপাশি ছত্তীসগড় ও ঝাড়খণ্ডের মতো একাধিক রাজ্যেও প্রশ্নফাঁস বিরোধী লাগাতার প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে। এই রকম এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক আবহে উচ্চ আদালতের এই কঠোর রায় দেশের প্রতিটি প্রান্তে প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সমস্ত প্রভাবশালী ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতি এক স্পষ্ট ও জোরালো হুঁশিয়ারি বার্তা পৌঁছে দিল।