নিট প্রশ্নফাঁস কি তবে বহুস্তরীয় গভীর ষড়যন্ত্র? এনটিএ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য সিবিআইয়ের চার্জশিটে!

বিতর্কিত নিট (NEET-UG)-র প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি কোনও সাধারণ জালিয়াতি বা শেষ মুহূর্তে ঘটে যাওয়া আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল একাধিক রাজ্যের সুসংগঠিত এক গভীর চক্রান্ত। সিবিআইয়ের (CBI) পেশ করা সাম্প্রতিক চার্জশিটে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা বা এনটিএ (NTA)-র তরফ থেকে নিযুক্ত পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং উদ্ভিদবিদ্যার ৩ জন বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞও সরাসরি এই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

মামলাটিতে মোট ১৩ জন অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করে চার্জশিট জমা দিয়েছে সিবিআই। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, পরীক্ষা শুরু হওয়ার বহু মাস আগেই এই ফাঁসের পরিকল্পনা হয়েছিল। সরকারি দায়িত্বের চরম অপব্যবহার করে এনটিএ-র নিযুক্ত ওই বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্নপত্র এই চক্রের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সিবিআই জানিয়েছে, অভিযুক্তরা একটি সুসংগঠিত গোপন সাপ্লাই চেন তৈরি করেছিল, যেখানে কোচিং সেন্টারের মালিক, দালাল এবং মধ্যস্থতাকারীরা অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করত।

তদন্তে জানা গেছে, ২৫ লাখ টাকায় প্রশ্ন কেনাবেচা হয়েছে। এমনকী এক পরীক্ষার্থী ও তার বাবার কাছে ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। গ্যারান্টি হিসেবে পরীক্ষার্থীদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের আসল মার্কশিট এবং সই করা ব্ল্যাঙ্ক চেক রেখে দেওয়া হত। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, পিডিএফ ডকুমেন্ট এবং ইমেজের মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হত প্রশ্ন। বাজেয়াপ্ত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক ডিজিটাল রিপোর্ট থেকে ‘NEET’ নামাঙ্কিত একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও টেলিগ্রাম চ্যাটের সন্ধান পেয়েছে সিবিআই, যেখানে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন অবাধে আদান-প্রদান করা হয়েছিল।

কীভাবে তৈরি হত এই ফাঁসের জাল? জানা গিয়েছে, অভিযুক্তদের একজন শুভম খায়রনার ২৫ লাখ টাকায় ধনঞ্জয় লোখান্ডের কাছ থেকে প্রশ্ন কিনেছিলেন। ধনঞ্জয় সেই প্রশ্ন পেয়েছিলেন মনীষা ওয়াঘমারে নামে এক মহিলার থেকে। সিবিআই সূত্রের খবর, এই মনীষা নিয়মিত এনটিএ-র রসায়ন বিশেষজ্ঞ প্রহ্লাদ কুলকার্নির যোগাযোগে ছিলেন। কুলকার্নি ওই প্রশ্নপত্রের মারাঠি থেকে ইংরেজিতে ব্যাক ট্রানস্লেশনের দায়িত্বে ছিলেন। ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যম বানিয়ে এনটিএ বিশেষজ্ঞদের কাছে পৌঁছত চক্রের মাথারা। এমনকী এনটিএ-র এক বিশেষজ্ঞ প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর অফলাইনে ‘রিভিশন ক্লাস’ নেওয়ার নামে ফাঁস করা প্রশ্নই পড়িয়েছিলেন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে চার্জশিটে।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল পরীক্ষার ঠিক আগে একটি তথাকথিত “গেসিং পেপার” বা আনুমানিক প্রশ্নপত্র বাজারে আসাকে কেন্দ্র করে। পরে দেখা যায় আসল প্রশ্নপত্রের প্রায় ১২০ থেকে ১৪০টি প্রশ্ন হুবহু মিলে গেছে। রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, বিহার এবং কেরল জুড়ে কুরিয়ার নেটওয়ার্ক ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল এই প্রশ্নগুলি।

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ায় পরীক্ষা হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই মে মাসে পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করে এনটিএ। এর ফলে দেশের প্রায় ২৩ লাখ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। সিবিআই ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং পাবলিক এক্সামিনেশনস অ্যাক্ট ২০২৪-এর বিভিন্ন ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে। বর্তমানে অভিযুক্ত ১৩ জনই বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছে।