সম্পত্তির হিসাব দিতে হবে সোজাসুজি! সংসদ সদস্যদের কড়া নিয়মের বেড়াজালে বাঁধতে নতুন আইনের খসড়া প্রকাশ

পাক রাজনীতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লাগাম টানতে এবার অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলেছে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন (ECP)। সাধারণত নির্বাচনের ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় প্রত্যেক প্রার্থীকেই তাঁর সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির সঠিক হিসাব দিয়ে একটি বৈধ হলফনামা জমা দিতে হয়। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে, পাকিস্তানের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশ নেতাই এই নিয়মের তোয়াক্কা না করে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সংবলিত হলফনামা জমা দিয়ে থাকেন। এই ধরনের অসদুপায় ও জালিয়াতি প্রকাশ্যে আসার পরেই নড়েচড়ে বসেছে কমিশন। এই অনিয়ম ও লুকোচুরি চিরতরে বন্ধ করতেই এবার নির্বাচন পরিচালনার নিয়মে বড়সড় বদল আনতে চলেছে পাক নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ‘নির্বাচন আইন ২০১৭’ (Election Rules 2017)-এর বিধিমালার মধ্যে বেশ কিছু যুগান্তকারী সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো সংসদ সদস্য এবং প্রাদেশিক আইনসভার বিধায়কদের জমা দেওয়া সম্পদ ও দায়বদ্ধতার (Assets and Liabilities) বিবরণী যাচাই করার একচ্ছত্র এবং সরাসরি আইনি ক্ষমতা অর্জন করা।

কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি নতুন বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, বিদ্যমান আইনের রুল ১৩৭-এর অধীনে একটি অত্যন্ত কড়া শর্ত বা উপধারা যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই নতুন সংশোধনী কার্যকর হলে, কোনো সাংসদ বা বিধায়কের জমা দেওয়া সম্পত্তির হিসাব নিয়ে সামান্যতম অস্পষ্টতা বা সন্দেহ তৈরি হলেই নির্বাচন কমিশন সরাসরি সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সদস্যের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারবে। শুধু তাই নয়, এই তদন্তের স্বার্থে যেকোনো সরকারি বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বা বেসরকারী সংস্থাকেও তথ্য চেয়ে নোটিশ পাঠাতে পারবে কমিশন।

প্রস্তাবিত সংশোধনীটির খসড়ায় স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে এবং লিখিত জবাব দাখিল করতে আইনগতভাবে বাধ্য করা হবে। পাক নির্বাচন কমিশনের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপকে সাধারণ মানুষের সামনে স্বচ্ছতা বজায় রাখার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, এই আইনি পরিবর্তনের পুরো খসড়াটি বর্তমানে সাধারণ জনগণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ইসিপির সরকারি পোর্টালে ড্রাফটটি আপলোড করে আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বসাধারণের কাছ থেকে আপত্তি, মতামত ও পরামর্শ আহ্বান করা হয়েছে। নির্ধারিত শেষ তারিখের পর কমিশন প্রাপ্ত সমস্ত মতামত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই কঠোর পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক বেশ কিছু হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক মামলা। বর্তমানে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির বিরোধী দলীয় নেতা এবং পিকেএমএপি (PkMAP) প্রধান মাহমুদ খান আচাকজাইয়ের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক মামলার শুনানি চালাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে একটি গুরুতর মামলা সরাসরি তাঁর স্থাবর সম্পত্তি ও দেনার বিবরণীতে গরমিল সংক্রান্ত। এই মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য করা হয়েছে আগামী ১৯ আগস্ট, যা সাধারণ মানুষের মতামত জমা দেওয়ার শেষ তারিখের ঠিক চার দিন পরেই অনুষ্ঠিত হবে। একবার এই আইনগত সংশোধনী চূড়ান্তভাবে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কার্যকর হলে, পাক আইনসভায় বসা সাংসদ এবং দেশের অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।