কাগজ কি তবে অতীত? পকেটে আসছে রঙিন প্লাস্টিকের নোট! ২০২৭ সালেই বড় চমক দিতে চলেছে আরবিআই

প্লাস্টিকের নোট নিয়ে এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও যুগান্তকারী রূপরেখার কথা প্রকাশ করল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। সমস্ত পরিকল্পনা ঠিকঠাক এগোলে আগামী ২০২৭–২৮ অর্থবর্ষের শুরুতেই, অর্থাৎ ২০২৭ সালের এপ্রিল মাস থেকেই সাধারণ মানুষের পকেটে প্রবেশ করতে চলেছে আধুনিক পলিমার বা প্লাস্টিক ব্যাঙ্ক নোট। বুধবার মুম্বইয়ে আরবিআই-এর আর্থিক নীতি তদারকি কমিটির দ্বিমাসিক পর্যালোচনার পর এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই বিরাট আশাব্যঞ্জক ঘোষণাটি করেছেন স্বয়ং গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা।
নতুন এই পরিবর্তনের প্রথম ধাপে সবচেয়ে বেশি হাতবদল হওয়া ছোট মূল্যমানের নোটগুলিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই ১০ টাকা এবং ২০ টাকার পলিমার নোট ছাপানোর জন্য আরবিআই-এর প্রস্তাবে সম্পূর্ণ সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে। পাইলট প্রজেক্ট তথা ফিল্ড ট্রায়ালের অংশ হিসেবে এই দুই মূল্যমানের ১০০ কোটি করে মোট ২০০ কোটি (দুই বিলিয়ন) পলিমার নোট বাজারে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সাধারণ তুলা থেকে তৈরি প্রচলিত কাগজের নোটের পরিবর্তে এই বিশেষ নোটগুলি তৈরি হবে অত্যন্ত উন্নতমানের প্লাস্টিক বা পলিমার সাবস্ট্রেট দিয়ে।
বিশ্বের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে সাক্ষ্য দেয় যে, সাধারণ কাগজের নোটের তুলনায় পলিমার নোট বহুগুণ বেশি টেকসই। জলবায়ু এবং ব্যবহারের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের বহু দেশে এই জাতীয় নোট কাগজের নোটের চেয়ে দুই থেকে চার গুণ বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়। এমনকি কিছু কিছু দেশে এর স্থায়িত্ব ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেখা গিয়েছে। ভারতে যেহেতু ১০ ও ২০ টাকার মতো ছোট নোটের লেনদেনের গতি অত্যন্ত বেশি, তাই এগুলি খুব দ্রুত ছিঁড়ে বা ময়লা হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। পলিমার নোট চালু হলে বার বার ক্ষতিগ্রস্ত নোট বাতিল করে নতুন নোট ছাপানোর বিপুল আর্থিক খরচ একধাক্কায় অনেকটাই কমে যাবে।
তবে এখনই দেশজুড়ে রাতারাতি ব্যাপক হারে পলিমার নোট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে এই প্রকল্পটি পরীক্ষামূলক ফিল্ড ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের তীব্র গরম, আর্দ্রতা, বৈচিত্র্যময় জলবায়ু, মানুষের ব্যবহারের ধরন এবং বর্তমান এটিএম পরিকাঠামোর সঙ্গে এই প্লাস্টিক নোট কতটা নিখুঁতভাবে মানিয়ে নিতে পারছে, তা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখবে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ট্রায়ালের ফলাফল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার পরেই পূর্ণাঙ্গ আকারে নোট চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে আরবিআই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, কাগজের নোট এখনই রাতারাতি বন্ধ হচ্ছে না। বাজারে নতুন পলিমার নোটের পাশাপাশি পুরোনো কাগজের নোটও সমান আইনি বৈধতা বা লিগ্যাল টেন্ডার নিয়ে পাশাপাশি চালু থাকবে।
উল্লেখ্য, ভারতের জন্য প্লাস্টিকের নোট আনার এই উদ্যোগ একেবারেই নতুন নয়। এর আগে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে, ২০১৪ সাল নাগাদ দেশের পাঁচটি নির্বাচিত শহরে এই ধরনের ট্রায়াল চালানোর একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে নানা প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে সেই সময় প্রকল্পটি থমকে গিয়েছিল। এবার সেই পুরনো পরিকল্পনাকেই আধুনিক রূপ দিতে আরবিআই-এর অধীনস্থ সংস্থা উন্নত সুরক্ষা ফিচারযুক্ত পলিমার সাবস্ট্রেট সংগ্রহের জন্য ইতিমধ্যেই দরপত্র আহ্বান করেছে। পলিমার নোটগুলির অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো এগুলিতে সহজে ধুলোবালি বা ময়লা জমা হয় না এবং এগুলি সম্পূর্ণ জলপ্রতিরোধী হয়। পাশাপাশি, এই পলিমার শিটের মধ্যে অত্যন্ত জটিল ও আধুনিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য বা সিকিউরিটি ফিচার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব, যা নকল বা জাল নোট তৈরির কারবারকে প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। বর্তমানে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে ইতিমধ্যেই অত্যন্ত সফলভাবে পলিমার নোট ব্যবহৃত হচ্ছে। সমস্ত ট্রায়াল সফল হলে ২০২৭ সালের শুরুতেই ভারতীয়দের হাতে দেখা মিলবে এই নতুন নোটের।