সেফ হারবার সুরক্ষা হারাতে পারে মেটা! প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও ডিলিট বিতর্কে কড়া মোচড় কেন্দ্রের!

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ফেসবুক পোস্ট কোনও রকম সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলা দেশজুড়ে বিতর্কের মাঝে এবার মেটার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করল কেন্দ্রীয় সরকার। সংসদের তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ বিষয়ক স্থায়ী কমিটি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী, নারী এবং শিশুদের নিশানা করে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর মাধ্যমে তৈরি কোনো আপত্তিকর কনটেন্ট প্রচারের অভিযোগ ওঠে, তবে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অধীনে মেটা তাদের প্রচলিত ‘সেফ হারবার’ (Safe Harbor) আইনি সুরক্ষা হারাতে পারে।

বুধবার সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ নিজের এই কঠোর অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট করে তুলে ধরেন সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান তথা বিশিষ্ট বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। তাঁর জোরালো দাবি, তেলঙ্গানা পুলিশের দায়ের করা সাম্প্রতিক একটি মামলায় খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে মহিলা ও শিশুদের সম্পর্কিত আপত্তিকর এআই-নির্মিত কনটেন্ট ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। পাশাপাশি, আর্থিক প্রতারণামূলক বিভিন্ন অ্যাপের প্রচার সংক্রান্ত অভিযোগে গুগল সংস্থার বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা দায়ের হয়েছে। এই ধরনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘটনায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯ ও ৭৯(১) ধারা এবং আইটি রুল ৭-এর বিধান অনুযায়ী কোনো প্রযুক্তি সংস্থাকেই আর ‘সেফ হারবার’ অনাক্রম্যতা বা আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশের সংবিধান এবং প্রচলিত আইন সুনির্দিষ্টভাবে মেনে তবেই সমস্ত সামাজিক মাধ্যমগুলিকে ভারতে কাজ করতে হবে।

এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যের ঠিক মাঝেই বুধবার ও বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসতে চলেছেন মেটার শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক কর্তারা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গত ২৩ জুলাইয়ের সেই আলোচিত ফেসবুক পোস্ট, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারি ও অন্যান্য বিষয়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছিলেন তিনি, সেটি হঠাৎ কিছু সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ বা ব্লক করে দেওয়ার ঘটনার পরেই ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (MeitY) মেটার গ্লোবাল কর্তাদের জরুরি ভিত্তিতে তলব করে। বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মেটার চিফ গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার জোয়েল ক্যাপলানও উপস্থিত থাকতে পারেন।

সরকারি সূত্রে আরও জানা যাচ্ছে যে, আজকের এই বৈঠকে কেবল প্রধানমন্ত্রীর সেই একটিমাত্র পোস্টের প্রসঙ্গই নয়, বরং আরও একাধিক অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর ইস্যু জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে। অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতিত্ব, শিশু যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত ক্ষতিকর কনটেন্ট (CSAM), ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টগুলির ডিজিটাল নিরাপত্তা, এআই-নির্ভর কনটেন্ট মডারেশন পদ্ধতি এবং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মেটার উচ্চপদস্থ কর্তাদের কাছে কড়া ব্যাখ্যা তলব করা হবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য, মেটার মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থার নিজস্ব এমন নিখুঁত পরিকাঠামো বা ব্যবস্থা থাকা একান্ত প্রয়োজন, যার মাধ্যমে যেকোনো ধরনের আপত্তিকর বা সম্পূর্ণ বেআইনি কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে, ভারতীয় আইন এবং সংস্কৃতির সম্পূর্ণ অনুগত থেকে ডিজিটাল কনটেন্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে সংস্থাকে আরও অনেক বেশি কার্যকর ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ করতে হবে।

উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই ইনস্টাগ্রাম প্ল্যাটফর্মে শিশু যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত আপত্তিকর বিজ্ঞাপন (CSAM) প্রকাশিত হওয়ার ঘটনা নিয়েও মেটার ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছিল। সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গত মাসেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কঠোর ভাষায় একটি সরকারি নোটিস পাঠিয়েছিল কেন্দ্র।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর ফেসবুক পোস্ট হঠাৎ সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার আকস্মিক ঘটনার পর মেটা কর্তৃপক্ষ প্রথমে এটিকে একটি এআই-নির্ভর সাধারণ ‘প্রযুক্তিগত ত্রুটি’ বলে দাবি করে ক্ষমা চেয়েছিল এবং পোস্টটি পুনরায় পুনরুদ্ধার করেছিল। তবে কেন্দ্র বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক মেটার এই সাফাইকে যথেষ্ট বা সন্তোষজনক বলে মনে করেনি। পরবর্তী সময়ে মেটার পক্ষ থেকে সরকারকে এই মর্মে আনুষ্ঠানিক আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী-সহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের পোস্টে ভবিষ্যতে কনটেন্ট মডারেশন সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংস্থার শীর্ষ স্তরে একাধিক ধাপে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হবে।