মোদীর ভিডিও ডিলিট কাণ্ডে চরম বিপাকে ফেসবুক! জুকারবার্গকে ৩ দিনের আল্টিমেটাম দিল সংসদীয় কমিটি!

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও আচমকা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ইস্যুতে এবার মেটা (Meta) প্রধান মার্ক জুকারবার্গকে (Mark Zuckerberg) চরম হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছে ভারতের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। জুকারবার্গকে অবিলম্বে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে এবং এই ঘটনার পেছনে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে—এই মর্মে স্পষ্ট ভাষায় তিন দিনের একটি কড়া আল্টিমেটাম জারি করেছে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি (Parliamentary Committee of Communications and IT)।
বিজেপি সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবের (Nishikant Dubey) নেতৃত্বে পরিচালিত এই সংসদীয় কমিটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভিডিও মুছে ফেলার ঘটনাকে সরাসরি ‘গণতন্ত্রের ওপর আঘাত’ বলে তীব্র ভাষায় আখ্যা দিয়েছে। কমিটির দ্ব্যর্থহীন মত, দেশের ১৪০ কোটি ভারতবাসীর নির্বাচিত শীর্ষ প্রতিনিধিকে এভাবে নিশানা করা অত্যন্ত গুরুতর ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।
বিশেষ সূত্রে প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, সংসদীয় প্যানেল অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, আগামী তিন দিনের মধ্যে মেটা যদি এই বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক পদক্ষেপ না করে এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা না চায়, তবে ভারত সরকার ফেসবুকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘সেফ হারবার’ (Safe Harbor) আইনি সুরক্ষা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করবে। যদি এই ‘সেফ হারবার’ অনাক্রম্যতা তুলে নেওয়া হয়, তবে ভারতের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ফেসবুকের শীর্ষস্থানীয় আধিকারিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি এফআইআর (FIR) দায়ের এবং ফৌজদারি মামলা রুজু করার আইনি রাস্তা পাকাপাকিভাবে খুলে যাবে।
কী ঘটেছিল এই গোটা ঘটনার নেপথ্যে?
এই পুরো ঘটনার সূত্রপাত গত ২৩ জুলাই। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে একটি বিশেষ ‘সেলফি-স্টাইল’ ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। এটিই ছিল এই বিশেষ ফরম্যাটে তাঁর প্রথম সরাসরি দেশবাসীর উদ্দেশে বার্তা। প্রশ্নপত্র ফাঁস (Paper Leak) কেলেঙ্কারি এবং সেই সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনাবলিকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র নেতৃত্বে দেশজুড়ে চলা ছাত্র বিক্ষোভের ঠিক মাঝেই, ভিডিওটিতে দেশের অপরাধীদের বিরুদ্ধে সর্বা্ত্মক ও কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার কড়া আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ভিডিওটি প্রথমে ইনস্টাগ্রামে এবং পরবর্তীতে ফেসবুকেও শেয়ার করা হয়েছিল।
কিন্তু অত্যন্ত অবাক করার মতো বিষয় হলো, পোস্ট করার ঠিক পরেই ফেসবুক মোদীর এই ভিডিওটির ওপর অপ্রত্যাশিতভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং তা প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে সাধারণ নেটিজেনদের প্রবল ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে পড়ে মেটা বাধ্য হয়ে ভিডিওটি পুনরায় প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনে। ভিডিওটি হঠাৎ গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সর্বপ্রথম নজরে আসে বিজেপি নেতৃত্ব এবং সোশ্যাল মিডিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। বিষয়টি চোখে পড়ামাত্রই তাঁরা মেটা কর্তৃপক্ষের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং তৎক্ষণাৎ এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দাবি করেন।
প্রযুক্তিগত ত্রুটির সমস্ত যুক্তি খারিজ করল মন্ত্রক
ঘটনার পরপরই চলতি সপ্তাহে মেটার শীর্ষস্থানীয় আধিকারিকদের তলব করে পুঙ্খানুপুঙ্খ জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল এই সংসদীয় কমিটি। সংসদীয় প্যানেলের সামনে হাজিরা দিয়ে মেটার প্রতিনিধিরা ক্ষমা চান এবং পুরো ঘটনাটিকে একটি সাধারণ ‘টেকনিক্যাল গ্লিচ’ বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন।
তবে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (MeitY) মেটার এই অজুহাতকে পুরোপুরি ‘অযৌক্তিক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। মন্ত্রকের সাফ বক্তব্য, মেটার মতো এত বড় প্রথম সারির আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থার থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রযুক্তিগত ভুল কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। যদি সত্যিই অতীতে কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা থেকে থাকে, তবে ভবিষ্যতে যেন এমন ভুল আর কখনও না ঘটে, তার জন্য মেটাকে অবিলম্বে তাদের অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো আরও বেশি জোরদার করতে হবে।
শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কন্টেন্ট নিয়েও জারি হলো কড়া বার্তা
কেবল প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও সংক্রান্ত কান্ডই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় সমস্ত ধরনের আপত্তিকর ও ক্ষতিকর কন্টেন্ট কড়া হাতে রুখতে আরও একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই সংসদীয় প্যানেল। গুগল (Google), ইউটিউব (YouTube), এক্স (পূর্বতন টুইটার), ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং স্ন্যাপচ্যাটের মতো বিশ্বসেরা সব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে মাত্র তিন দিনের মধ্যে সমস্ত ধরনের শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কন্টেন্ট (CSEAM) এবং বিশেষ করে মহিলাদের নিশানা করে তৈরি করা সমস্ত আপত্তিকর উপাদান অবিলম্বে মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করলে প্ল্যাটফর্মগুলিকে অত্যন্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে কমিটি।
অন্যান্য পৃথক মামলায় আইনি বিপাকে গুগল ও মেটা
অন্যদিকে, ইতিমধ্যেই পৃথক আইনি ফাঁসে জড়িয়ে পড়েছে দুই প্রযুক্তি জায়ান্ট সংস্থা। আলাদা দুটি অভিযোগে গুগল ও মেটার বিরুদ্ধে অফিসিয়ালি এফআইআর দায়ের করেছে তেলেঙ্গনা পুলিশ। প্রতারণামূলক ভুয়া আর্থিক অ্যাপের প্রচার এবং তা হোস্টিংয়ের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে গুগলকে। আর অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ভুয়ো ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় অবাধে ছড়িয়ে পড়ার অনুমতি দেওয়ায় মেটার বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা রুজু করেছে তেলেঙ্গনা পুলিশ।