তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআই-এ যাওয়া ২০ সাংসদের নবান্ন অভিযান! শুভেন্দুর সঙ্গে গোপন বৈঠকে কী ঠিক হল?

রাজ্য রাজনীতিতে বর্তমানে এক চরম চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শাসক দলের অন্দরের ক্ষোভ এবং ভাঙনের জল্পনাকে সত্যি করে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসা ২০ জন লোকসভার সাংসদ নতুন রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই (NCPI)-এর ব্যানারে একত্রিত হয়েছেন। সম্প্রতি নয়াদিল্লির হেইলি রোডের বঙ্গভবনে বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে দেওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই গোপন মধ্যাহ্নভোজের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদব। সূত্রের খবর, দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের অন্দরে কোণঠাসা হয়ে থাকা এই বিদ্রোহী সাংসদরা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছিলেন কবে তাঁদের এই রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সুরাহা হবে।
বৈঠকের শুরুতেই ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিক অত্যন্ত নাটকীয় ঢঙে নিজের দলের অভ্যন্তরে চলা বঞ্চনা ও মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিজের সাংসদ তহবিলের টাকা নিজের বিধানসভা এলাকায় বরাদ্দ করার পরেও যদি স্থানীয় বিধায়কদের কাছ থেকে অপমানিত হতে হয়, তবে এই সাংসদ পদের আর কোনো অর্থ থাকে না। নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি রূপক হিসেবে অমিতাভ বচ্চনের বিখ্যাত ‘দিওয়ার’ ছবির ‘বিল্লা নম্বর ৭৮৬’-এর প্রসঙ্গ টেনে আনেন। এরপরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি তাঁদের কাছে জানতে চান যে তাঁরা ঠিক কী চাইছেন। জবাবে এনসিপিআই সাংসদরা স্পষ্ট জানান যে, তাঁরা মূলত আত্মসম্মান ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি চান। তাঁরা দাবি করেন যে, যেহেতু তারা এখন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএ-র শরিক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে চলেছেন, তাই অন্য রাজ্যে বিজেপির শরিকরা যেমন সম্মান ও গুরুত্ব পান, তাঁদেরও সেই একই মর্যাদা দিতে হবে।
এই দাবি আদায়ের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ফর্মুলাও প্রস্তাব করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে, বারাসতে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের সাংসদ কার্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিজেপি বিধায়করা উপস্থিত থাকবেন এবং একইভাবে ব্যারাকপুরে পার্থ ভৌমিকের কার্যালয় উদ্বোধনে অর্জুন সিং সহ জেলার অন্যান্য বিজেপি নেতারা যোগ দেবেন। এর ফলে নিচুতলার কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সঠিক বার্তা পৌঁছবে। এই প্রস্তাব শোনার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এটিকে একটি অত্যন্ত ‘ভাল প্রস্তাব’ বলে সাধুবাদ জানান এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সহযোগিতা চান। ভূপেন্দ্র যাদবও এই বিষয়ে দলীয় স্তরে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সম্পূর্ণ সম্মতি দেন।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছে। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১৮ বা ১৯ অগস্ট এনসিপিআই-এর এই ২০ জন সাংসদকে নবান্নে একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তলব করবেন মুখ্যমন্ত্রী। শুধু সাংসদরাই নন, তাঁদের নিজ নিজ এলাকার স্থানীয় বিধায়কদেরও ওই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হলো রাজ্যজুড়ে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া যে এই বিদ্রোহী নেতারা এখন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন। পাশাপাশি, এলাকার গরিব মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য এই সাংসদদের জনপ্রতি ৫ হাজার করে ত্রিপল এবং অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের জন্য ৫ হাজার করে নতুন উপভোক্তার নাম সুপারিশ করার বিশেষ বোনাস সুবিধাও দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। তবে এই সমস্ত প্রলোভনের চেয়েও সাংসদরা তাঁদের রাজনৈতিক সম্মান ও সুরক্ষাকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।