তারাতলার মতো দুর্ঘটনা আর নয়! বহুতল নির্মাণে নজরদারির দায়িত্বে এবার জাতীয় স্তরের থার্ড পার্টি এজেন্সি, ঘোষণা প্রশাসনের

তারাতলার নির্মীয়মান গুদামের ছাদ ধসে শ্রমিক মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনার পরই নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসন। বেআইনি নির্মাণ ও অনিয়ম চিরতরে রুখতে সোমবার নবান্নে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তলব করা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সহ দফতরের অন্যান্য পদস্থ আধিকারিকেরা। বৈঠক শেষে মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, বেআইনি নির্মাণ ও নিয়ম ভাঙার প্রবণতা নিয়ে রাজ্য সরকার আর বিন্দুমাত্র রেয়াত করবে না।

তারাতলা বিপর্যয়ের পরেই মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কলকাতা পুরনিগমও সেই সময় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। তবে এবার থেকে রাজ্যে চলমান সমস্ত বহুতলের নির্মাণকাজের গোটা প্রক্রিয়ার উপর আরও কঠোর নজরদারি চালানোর সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং বিশৃঙ্খলা দূর করতে সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ‘কাট-অফ ডেট’ নির্ধারণ করে দিয়েছে।

মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এদিন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘‘আমরা কাট-অফ ডেট রাখছি ৩১ মার্চ ২০২৬। এর মধ্যে যে বাড়িগুলো হয়েছে, আমাদের কাছে যদি অভিযোগ আসে বা আমাদের নিজেদের যে সার্ভে চলছে, সেখানে যদি দেখি কোনও অনিয়ম হয়েছে, সামান্য এদিক-ওদিক হলে সেটা ঠিক করে নেওয়া যাবে।’’

তবে সামান্য ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ থাকলেও বড়সড় ও গুরুতর বেআইনি কাজের ক্ষেত্রে প্রোমোটারদের অত্যন্ত কড়া শাস্তির মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। টাকার বিনিময়ে বেআইনি নির্মাণকে আইনি বৈধতা পাইয়ে দেওয়ার দীর্ঘদিনের পুরনো প্রথা এবার সম্পূর্ণ ভাঙতে চাইছে বর্তমান সরকার। অগ্নিমিত্রা পালের দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্পষ্ট বার্তা, যদি দেখা যায় দুতলার ছাড়পত্র নিয়ে কেউ পাঁচতলা ভবন তৈরি করে ফেলেছেন এবং উপরে পেন্টহাউস বা অতিরিক্ত সিঁড়ি-এসক্যালেটর বসিয়েছেন, তবে সেখানে বিশাল অঙ্কের জরিমানা ধার্প করা হবে। এমন রেকর্ড জরিমানা করা হবে যা শোধ করতে প্রোমোটারদের চরম কষ্ট হবে।

এই কঠোর অবস্থানের পেছনে মাটির বৈজ্ঞানিক প্রকৃতির যুক্তিও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি ব্যাখ্যা করে জানান যে এখানকার মাটি অত্যন্ত নরম পলিমাটি দিয়ে গঠিত। যেখানে ফাউন্ডেশন করা হয়েছে দুতলার বাড়ির জন্য, সেখানে নিয়ম ভেঙে পাঁচতলা নির্মাণ করা হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং তা চরম বিপজ্জনক হতে পারে।

বহুতল আবাসিক নির্মাণের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবনগুলির তীব্র পার্কিং সমস্যা নিয়েও এদিন নিজের ক্ষোভ উগরে দেন মন্ত্রী। বহু বাণিজ্যিক ভবনে নিজস্ব পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা না থাকায় কর্মীরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় বা ফুটপাতে বাইক ও গাড়ি রাখেন। এই বিপজ্জনক প্রবণতা অবিলম্বে রুখতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অগ্নিমিত্রা পাল সাফ জানিয়ে দেন যে সংস্থায় দুইশ কর্মী থাকলে তাদের বাইক রাখার জন্য নিজস্ব পার্কিং স্পেস কিনতে হবে এবং সেখানেই গাড়ি রাখতে হবে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ছাড়পত্র না থাকলে যেমন কাজ এগোয় না, তেমনই পার্কিংয়ের যথাযথ জায়গা না দেখালে এবার থেকে বাণিজ্যিক ভবনের ছাড়পত্র আটকে দেওয়া হবে।

ভবিষ্যতে তারাতলার মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে এবার থেকে নির্মাণকাজে সুনির্দিষ্ট নজরদারির জন্য জাতীয় স্তরের সংস্থাকে নিয়োগ করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবান্ন। তারাতলার ওই ভয়াবহ ঘটনার জন্য পূর্বতন সরকারের নজরদারির মারাত্মক অভাবকেই সরাসরি দায়ী করেছেন বর্তমান নগরোন্নয়ন মন্ত্রী। তিনি জানান যে জাতীয় স্তরের কিছু থার্ড পার্টি সংস্থাকে নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় আর না ঘটে। এখন থেকে প্রতিটি নির্মাণের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ওই তৃতীয় পক্ষের নজরদারি থাকবে এবং তাদের সবুজ সংকেত ছাড়া পরবর্তী ধাপে এগোনো যাবে না। মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই সরকার এই চূড়ান্ত কঠোর পথ বেছে নিয়েছে।